মঙ্গলবার ২৫ ফেব্রুয়ারি। ভোর সাড়ে চারটায় টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে ডাকাত বাহিনী দেশীয় অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। ছিনিয়ে নেয় নগদ দেড় লাখ টাকা, দেড় ভরি স্বর্ণ, ১০টি স্মার্টফোন। সবচেয়ে ভয়ংকর অভিযোগ, এই ঘটনায় শ্লীলতাহানি হয় ৩ ছাত্রীর।
এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি সোমবার ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলন্ত বাসে ডাকাতি ও এক নারীর শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে। রোববার ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় আনোয়ার হোসেন নামে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে এবং গুলি করে স্বর্ণ ও নগদ অর্থ ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। জনমনে তৈরী হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া।
রোববার ২৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে সাভারে বাড়িতে ঢুকে ছোট পর্দার এক অভিনেতাকে তিনটি গুলি করে দুর্বৃত্তরা। আহত হন তার মা ও স্ত্রী। সোমবার ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে পুলিশের ওপর হামলা করে হাতকড়াসহ পালায় ধর্ষণ মামলার আসামি। বুধবার ২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজবাড়ীতে ডিবি পুলিশের ওপর হামলা করে ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়া হয় মাদক মামলার এক আসামি।
মোহাম্মদপুরে ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি সহ অপরাধমুলক কর্মকাণ্ডে প্রতিদিনই উৎকণ্ঠায় এলাকাবাসী।
গণমাধ্যমের সংবাদ, বারবার অভিযোগ করেও মিলছে না কোনো প্রতিকার। সাম্প্রতিক এই চিত্র দেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক ব্যবহারকারী লেখেন, সব দেখে একে মনে হচ্ছে ঢাকা এখন গ্যাংস অফ ওয়াসীপুর এর সেট।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, গত জানুয়ারিতে দেশে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় ২৪২টি মামলা হয়েছে। গত বছরের একই মাসের তুলনায় যা ৬৯ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে মামলার পরিমান ছিলো গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৫টি (৭০ শতাংশ) বেশি।

সব মিলিয়ে গত আগস্ট থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে ডাকাতি ও দস্যুতার ১ হাজার ১৪৫টি মামলা দায়ের হয়, যা ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারির তুলনায় ৩৮২টি বেশি (৫০ শতাংশ) অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুন। দেশের ৫ আগস্টের অভূতপূর্ব গণজোয়ার আর গণঅভ্যুত্থানের প্রায় ৫ মাস পর দেশে সামগ্রীক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র অনেকটাই এমন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর জল গড়িয়েছে অনেকটাই। দেশের নেতৃত্বে উপদেষ্টা পদে এসেছেন দেশকে গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া সামনের সারির সমন্বয়কেরা। ঘোষণা এসেছে ছাত্রদের নতুন দল গঠনের। উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম রাজপথে নেতৃত্ব দিতে ছেড়েছেন উপদেষ্টার পদ।
অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে দেশের মানুষ যে শোষণ, বৈষম্য, দুর্নীতিহীন একটি সুখি-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছে তা গড়তে সে পথে হাঁটার চেষ্টা দেখা গেলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মব-সংস্কৃতি, এবং নাজেহাল অর্থনীতির কারণে পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। দেশ জুড়ে চলমান অস্থিরতা আর আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে শঙ্কায় সাধারণ মানুষ।
সন্ত্রাস দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে এরই মধ্যে দেশে শুরু হয়েছে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে পরিচালিত অপারেশন ডেভিল হান্ট। আইন শৃঙ্খলা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে মধ্য রাতেও আকস্মিক পুলিশের টহল কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তবে এত কিছুতে যে খুব বেশি পরিবর্তন হচ্ছে তা চলতি পরিস্থিতি বলছে না।
দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পর আস্থাহীনতা, মতানৈক্যতা এবং অভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থিরতায় যখন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অনেকটাই নাজুক ঠিক সেই সময় দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখেন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান| বক্তব্য রাখেন দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থির অবনতি নিয়ে।
মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় শহীদ সেনা দিবসে রাওয়া ক্লাবে ২০০৯ সালে পিলখানায় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডে শাহাদতবরণকারী সেনা কর্মকর্তাদের স্মরণে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি সতর্ক করে বলেন, আমি আপনাদের সতর্ক করে দিচ্ছি, পরে বলবেন যে আমি সতর্ক করিনি। আমি আপনাদের সতর্ক করে দিচ্ছি। আপনারা যদি নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ না করতে পারেন, নিজেরা যদি কাদা–ছোড়াছুড়ি করেন, মারামারি-কাটাকাটি করেন, এই দেশ এবং জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে। আমি আজকে বলে দিলাম নইলে আপনারা বলবেন যে আমি আপনাদের সতর্ক করিনি। আমি সতর্ক করে দিচ্ছি আপনাদের। এই দেশ আমাদের সবার। আমরা সবাই সুখে-শান্তিতে থাকতে চাই। আমরা চাই না হানাহানি, কাটাকাটি, মারামারি।

দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য গুরুত্বের সাথে দেখছেন দেশের সাধারণ জনগণ। দেশে চলমান অরাজকতা নিয়ে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, দেশে এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপের পেছনে কিছু কারণ আছে। প্রথম কারণটা হচ্ছে যে আমরা নিজেরা হানাহানির মধ্যে ব্যস্ত। একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারে ব্যস্ত। এটা একটা চমৎকার সুযোগ অপরাধীদের জন্য। যেহেতু আমরা একটা অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে বিরাজ করছি, তারা খুব ভালোভাবেই জানে যে এই সময়ে যদি এই সমস্ত অপরাধ করা যায়, তাহলে এখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব। সেই কারণে এই অপরাধগুলো হচ্ছে। আমরা যদি সংগঠিত থাকি, একত্রিত থাকি, তাহলে অবশ্যই এটা সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য কেবল সাধারণ মানুষই নয়, দেশের রাজনীতিবিদের মাঝেও তৈরী করেছে বিশেষ ভাবনার জায়গা। তার দীর্ঘ বক্তব্যে দেশের স্থিতিশীলতায় সেনাবাহিনীর ভুমিকা প্রসঙ্গেও কথা বলেছেনন সেনাপ্রধান। বলেন, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই—এগুলো দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে অতীতে। খারাপ কাজের সাথে অসংখ্য ভালো কাজ করেছে।
আজকে যে দেশের স্থিতিশীলতা, দেশটাকে যে এত বছর স্থিতিশীল রাখা হয়েছে, এটার কারণ হচ্ছে এই সশস্ত্র বাহিনীর বহু সেনাসদস্য, সিভিলিয়ান—সবাই মিলে এই অর্গানাইজেশনগুলোকে, অসামরিক-সামরিক সবাই মিলে এই অর্গানাইজেশনগুলোকে ইফেক্টিভ (কার্যকর) রেখেছে। সেই জন্য আজকে, এত দিন ধরে আমরা একটা সুন্দর পরিবেশ পেয়েছি। এর মধ্যে যারা কাজ করেছে, যদি অপরাধ করে থাকে, সেটার শাস্তি হবে। অবশ্যই শাস্তি হতে হবে। না হলে এই জিনিস আবার ঘটবে। আমরা সেটাকে বন্ধ করতে চাই চিরতরে। কিন্তু তার আগে মনে রাখতে হবে, আমরা এমনভাবে কাজটা করব, এই সমস্ত অর্গানাইজেশনগুলো যেন আন্ডারমাইন না হয়।
দেশ ও জাতি এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সেনা প্রধান বলেন, আমাদের মধ্যে মতের বিরোধ থাকতে পারে, চিন্তাচেতনার বিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু দিন শেষে দেশ ও জাতির দিকে খেয়াল করে আমরা সবাই যেন এক থাকতে পারি। তাহলেই এই দেশটা উন্নত হবে, এই দেশটা সঠিক পথে পরিচালিত হবে। না হলে আমরা আরও সমস্যার মধ্যে পড়তে যাব। বিশ্বাস করেন, ডোন্ট ওয়ান্ট টু হেড, ওই দিকে আমরা যেতে চাই না।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রায় ৭ মাসের মাথায় দেশের চলমান পরিস্থিতিতে ওয়াকার-উজ-জামানের এই বক্তব্যকে অনেকেই দেখছেন ওয়েক আপ কল হিসেবে। অনেকেই বলছেন সেনাপ্রধানের বলা ‘ইনাফ ইজ ইনাফ‘ কথাটির প্রভাব এবং প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে সাধারণ জনতার চাওয়া কেবল প্রতিক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয় বরং দেশের রাজনীতি, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, শোষণ, বৈষম্যহীন একটি সুখি, সমৃদ্ধ ভূখণ্ডই সাধারণ মানুষের শেষ চাওয়া।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







