গত ২৮ অক্টোবর বিএনপি-জামায়াতের সরকারবিরোধী আন্দোলন ঘিরে কয়েকটি উদাহরণ দেবো। ২৮ অক্টোবরের দু’দিন আগে বিএনপির নামে একটি বিজ্ঞপ্তি ছড়িয়ে পড়ে সেখানে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে ‘আপনারা যারা ঢাকায় আসবেন পরিবারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসবেন’ বিজ্ঞপ্তিটি কয়েকটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমেও প্রচার হলো। ২৮ অক্টোবরের পর বিএনপির মিডিয়া সেল এর ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে বলা হয়, আলোচিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি ভুয়া।
আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট চেকিং নেটওয়ার্ক স্বীকৃত বাংলাদেশের একটি ফ্যাক্ট চেকিং বা তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারও সম্প্রতি ২৮ অক্টোবর ঘিরে কী পরিমাণ গুজব ছড়ানো হয়েছিল এর একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানেও পরিবার থেকে বিদায় নেয়ার গুজবটি প্রথম দিকেই আছে। এর আগে ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার পর ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়, যাতে দেখা যাচ্ছিল একটি ট্রেন উপচেপড়া যাত্রীসমেত চলছে। বলা হয়- বিএনপির মহাসমাবেশে যোগ দিতে মানুষের ঢাকায় আসছে। রিউমর স্ক্যানার বলছে, ২০২২ সালের অক্টোবরে বিএনপির খুলনার সমাবেশে জনগণের যোগদানের ছবি হিসাবে এই ভিডিওটিই প্রচার হয়েছিল। এটি আসলে ২০১৯ সালের বিশ্বইজতেমা শেষে মুসল্লিদের বাড়ি ফেরার দৃশ্য।
২৭ অক্টোবর সকালে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার স্বাক্ষর করা প্রেস বিজ্ঞপ্তির আদেলে একটি ছবি ছড়ায়। যেখানে বলা হয়- ২৮ অক্টোবর চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু টানেলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কারণে ঢাকায় পূর্বঘোষিত শান্তি সমাবেশ স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সারাদেশের জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু টানেলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অনুরোধ করা হয়। পরে বিপ্লব বড়ুয়া নিজেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে বিজ্ঞপ্তিটি ভুয়া৷ ঢাকার সমাবেশ স্থগিত হয়নি।
২৭ অক্টোবর রাতে ইউটিউবের একটি ভিডিওর মাধ্যমে প্রচার করা হয়, পুলিশের বেড়ি ভেঙে রাতের শাপলা চত্বর দখলে নিলো জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। পরে রিউমর স্ক্যানার ভিডিওটি যাচাই করে দেখতে পায়, এটি সাম্প্রতিক কোনো দৃশ্য নয়। ২০২১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় জামায়াতে ইসলামীর বিক্ষোভ মিছিলের একটি ভিডিও। কিন্তু যতক্ষণে ফ্যাক্টচেক প্রকাশ হয়, ততক্ষণে প্রায় ১২ লাখেরও বেশি মানুষ ভিডিওটি দেখেছে। এরকম শত শত মিথ্যা তথ্য ছড়ায় ২৮ অক্টোবর ঘিরে। এর বেশিরভাগই ছিল সরকারবিরোধী এবং সহিংসতার জন্যে উস্কানিমূলক।

এখানে তো মাত্র কয়েকটা উদাহরণ দেয়া হলো। এরই মধ্যে সেদিনের সব গুজব সত্য হয়ে মানুষের সামনে আসছে। এখন এ নিয়ে হাসাহাসি হচ্ছে। যে কেউ গুগলের কল্যাণে একটা একটা করে সেসব ঘটনা দেখে নিতে পারেন। আজ ঘটনার ২০দিন পর আমরা সেই ভুল তথ্য বিশ্লেষণে বসছি। আজ আমরা হাসছি, অথচ ওই দিনের কথা মনে করেন, কী ভয়বহ আতঙ্কের মধ্য দিয়ে গেছে! আমার ব্যক্তিগত মত, ওই ভয়াবহ দিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে পাওয়া বেশিরভাগ তথ্যই ভুল। যারা মাঠে ছিলেন তারাও ভুল তথ্যের ওপর ভর করে ছিলেন। কেউ সহিংসতা করছিলেন, কেউ সহিংসতার স্বীকার হচ্ছিলেন। পাঠক একবার ভাবুন, এখন যত বিশ্লেষণই করি, ওই দিন নিহত দুইজনকে আমরা ফেরত পাবো?
আসলে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিটাই এমন। একদল মিথ্যাবাদী ভুল তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতি সবসময় উৎতপ্ত করছেন। ‘সবসময়’ শব্দটি আমি আসলে ইচ্ছে করেই ব্যবহার করছি। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে মিথ্যা বিষয়টি আমাদের জীবন যাপনের সঙ্গে মিশে গেছে। অনেকেই হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক দিক সামনে আনতে চাইবেন। আমিও চাই, কিন্তু পারি না। কারণ এই দেখুন, রিউমর স্ক্যানারই ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ইন্টারনেটে প্রচারিত ১০৮২টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে ৭৪টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত। এই আট মাসে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে সর্বোচ্চ ৪৩ টি ভুল তথ্য প্রচার হয়েছে।
সংসদ নির্বাচন নিয়ে ৭৪টি ভুল তথ্য প্রচারই আমার এই লেখার উদ্দেশ্য। পাঠক খেয়াল করুন ওই সংস্থাটি ২০২২ সালে ১৪০০টি ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদন দেয়। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ছিল ৮২টি, ফেব্রুয়ারিতে ৯০টি, মার্চে ১১৯টি, এপ্রিলে ৯০টি, মে মাসে ৭২টি, জুন মাসে ১৩০টি, জুলাইয়ে ১০৫টি, আগস্টে ১৫০টি, সেপ্টেম্বরে ১৩৩টি, অক্টোবরে ১৩০টি, নভেম্বরে ১৪২টি এবং ডিসেম্বর মাসে ১৫৭টি প্রতিবেদন। আমি লেখায় একটি প্রতিষ্ঠানের কথাই উল্লেখ করছি। আমার জানা মতে, সরকারি বেসরকারি আরও কিছু প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্ট চেক করে। কিন্তু রিউমর স্ক্যানার প্রকাশ করে। যাই হোক অন্যরা তালিকা প্রকাশ করলে ভুল তথ্য প্রচারের তালিকাটা হয়তো দীর্ঘ হতো।
যদিও ভুলের দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ আমার লক্ষ্য নয়। গুজব যে কত নিয়মিত সেটা পরিস্কার করা। এরপর আমার প্রশ্ন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কী একটিও মিথ্যা তথ্য প্রচার করা যাবে? নির্বাচনের মত সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে কী ২৮ নভেম্বরের মত অবস্থা করা যাবে? কিম্বা ২৮ নভেম্বরের মত পরিস্থিতির আশঙ্কা সত্বেও কী সুষ্ঠু নির্বাচন হবে? ধরা যাক সহিংসতা হলো না। কিন্তু গুজববাজরা এরকমই অ্যাকটিভ থাকলো। তাতে কী নির্বাচনে কোন ভদ্রলোক তার কাঙ্ক্ষিত ফলটি পাবেন?
এবছর আগস্ট মাসের প্রথমদিকে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অপপ্রচার রোধে ফেসবুকের সহায়তা চেয়েছিল নির্বাচন কমিশন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধির সঙ্গে একটা বৈঠকও হয় ইসির। সে সময় ইসি থেকে বলা হয়েছিল, সংসদ নির্বাচনের আগে ভুল তথ্য বা মিথ্যা তথ্য প্রচার বন্ধে সহায়তা করতে চায় ফেসবুক। তফসিল ঘোষণার পর তারা ইসির সঙ্গে কাজ করবে। বৈঠকে ছিলেন ফেসবুকের প্যারেন্ট কোম্পানি মেটার বাংলাদেশ বিষয়ক হেড অব পাবলিক পলিসি রুজান সারওয়ারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। তারা জানায়, অপপ্রচার, ঘৃণামূলক মন্তব্য এবং সাম্প্রদায়িকতা লঙ্ঘন হয় এমন ধরনের কনটেন্ট মুছে সহযোগিতা করা যেতে পারে।
আমার ব্যক্তিগত মত, ফেসবুকের টিম যেটুকু করতে চেয়েছে এটুকু করলেই অনেক বড় কাজ করা হবে। কারণ আমরা আসলেই গুজবে ভাসছি। গণমাধ্যমগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়েছে। গুজববাজদের মত করে চলতে না চাওয়ায় তারাও ভয়াবহ গুজবের স্বীকার। ২৮ অক্টোবর সরকার বিরোধীদের হাতে অকারণে মার খেয়েছে ২৮ জন সাংবাদিক। একদিকে তাদের নাম ব্যবহার গুজব ছড়ানো হচ্ছে, আরেকদিকে রাস্তায় সরকারবিরোধীদের রোষে পড়ছে। এই মুহূর্তে গুজবের মুখে সাংবাদিক, গুজবের মুখে রাজনীতিক। কেউ কাউকে রক্ষা করতে পারছে না।
কিন্তু নির্বাচনের তফসিল হয়ে গেছে, এখনও গুজবের ফেসবুকের কোন কাজ শুরু করার নাম গন্ধ পাচ্ছি না। নির্বাচন কমিশন বিটে কাজ করেন, এমন কয়েক জন রিপোর্টারের সঙ্গে কথা বলেছি। তারাও কিছু বলতে পারেন না। আমি নেতিবাচক হতে চাই না। হয়তো অপপ্রচার রোধে শিগগির কাজ শুরু করবে ফেসবুক। বিষয়টি হয়তো এখনও জনায়নি ইসি। কাজ করার কথা যেহেতু বলেছেন, করবেন নিশ্চয়ই। কিন্তু আরেক শক্তিশালী সামাজিক মাধ্যম ইউটিউব। তাদের সঙ্গে এমন কোন বৈঠকের খবরও কিন্তু পাইনি। তাদেরকেও নির্বাচনের আগে আমাদের অপপ্রচার রোধে যুক্ত করা দরকার।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







