ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন তারেক রহমান। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রায় ১৮ মাস দেশ পরিচালনা করে অন্তর্বর্তী সরকার। যার নেতৃত্বে ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পার করে আসা এই নতুন সরকারের কাছে তাই প্রত্যাশার মাত্রাও অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
‘শান্তিতে বাঁচতে চাই’
রাজধানীর একটি চায়ের দোকানে বসে থাকা সালাম হোসেন নামের একজন চা বিক্রেতার কথায় ফুটে ওঠে সাধারণ মানুষের সরল চাওয়া, “আমরা কী চাইলেই পাই নাকি! তা-ও নতুন সরকার আমাগো দেখবো, এটাই চাই। সবাই যেন শান্তিতে দুইটা খেয়ে বাঁচতে পারে।”
তার প্রত্যাশা খুব বড় নয়। দ্রব্যমূল্য কমুক, আয়-রোজগার ঠিক থাকুক, নিরাপদে দিন কাটুক। ক্রীড়া সাংবাদিক তামিম সানিয়াত তন্ময়ের প্রত্যাশা একটু বিস্তৃত। তিনি বলেন, “প্রত্যাশার পরিধিটা অনেক বড়। সবাই ভালো থাকুক, দেশের মানুষের উন্নয়ন হোক। সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। অগ্রগতি হোক।”
সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল খান বলেন, “আমাদের প্রত্যাশা, নতুন সরকার জুলাই সনদ এবং সংবিধান সংস্কারের কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করবে এবং দেশকে দুর্নীতি এবং সিন্ডিকেট মুক্ত করবে। প্রশাসন ও আইন ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন করবে।”
তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ
এই সরকারের কাছে প্রত্যাশার জায়গাটা তিন ধরনের বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, “প্রথমত, ভঙ্গুর অর্থনীতি ঠিক করতে হবে। লুটপাট, ব্যাংকে বিশৃঙ্খলার লাগাম টানতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইন শৃঙ্খলা সঠিক জায়গায় আনতে হবে। সামাজিক ক্ষেত্রে নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা থামাতে হবে। তৃতীয়ত, দুর্নীতির লাগাম টানা। এটা একটা বড় প্রত্যাশা।”

তার ভাষায়, “দুর্নীতি সীমাহীন হয়ে গেছে। বলতেই হচ্ছে অন্তবর্তী সরকার এই ক্ষেত্রে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। দুর্নীতির লাগাম না টানলে আপনি যতই অর্থনীতি ভালো করেন কোন লাভ নেই। আরেকটি বিষয় হল, সামাজিক খাতে দৃষ্টি দেওয়া- যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য।”
কৌশলগত উদ্যোগের দাবি
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, “এই সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। গণ-অভ্যুত্থানের ত্যাগ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, আর তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন সরকারের কাঁধে।”
তার ভাষায়, “আমি মনে করি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে ৩-৪টা দলিল আছে, যা নিয়ে তাদের একটি জাতীয় কৌশল তৈরি করতে হবে। এগুলো হলো- তাদের রাষ্ট্র সংস্কার কাঠামোর ৩১ দফা দাবি, নির্বাচনী ইশতেহার, জুলাই সনদ ও দুদক সংস্কার কমিশনের যে প্রস্তাবনা। এই বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে নিয়ে একটি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রক কৌশল বানাতে হবে।”
বহুমাত্রিক প্রত্যাশা
ইন্টারস্পোর্ট এশিয়া প্যাসিফিক লিমিটেড (বাংলাদেশ লিয়াজোঁ অফিস) এর সিনিয়র কোয়ালিটি কন্ট্রোল স্পেশালিস্ট সুব্রত কুমার সাহা বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমার প্রত্যাশা হচ্ছে- দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী করা, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সরকার প্রতিষ্ঠা করা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বাস্তবমুখী সংস্কার এবং তরুণদের জন্য সুযোগ বৃদ্ধি। এসব বিষয়ে স্পষ্ট ও কার্যকর রোডম্যাপ দেখানোও গুরুত্বপূর্ণ।”

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “ইতিমধ্যে এই সরকারের কিছু ইতিবাচক দিক দেখা গেছে। যেমন, সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত গাড়ি না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। যা খুবই ইতিবাচক।”
স্বপ্ন আর বাস্তবতার লড়াই
নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে স্বপ্ন ও বাস্তবতার মিশেলে। গণ-অভ্যুত্থানের আবেগ, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি এবং নির্বাচনী ম্যান্ডেট সব মিলিয়ে মানুষ একটি “নতুন বাংলাদেশ” এর স্বপ্ন দেখছে।
কিন্তু একই সঙ্গে অনেকে বলছেন, এবার আর ভুল করার সুযোগ নেই। প্রথম কয়েক মাসে যদি দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে, দ্রব্যমূল্য কমে, আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে জনআস্থা দৃঢ় হবে।
সব মিলিয়ে এই সরকার শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নয়; এটি সময়ের দাবি ও জনগণের প্রত্যাশার সরকার। মানুষ এখন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়। বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়।








