দেশের কর্পোরেট অঙ্গনের পরিচিত মুখ, এসিআই লজিস্টিকস (স্বপ্ন)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির বলেছেন, বাজারে বিদ্যমান সিন্ডিকেট ভাঙতে বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। তার ভাষায়, আমরা সিন্ডিকেট ব্রেক করতে চাই এটি শুধু ব্যবসায়িক লক্ষ্য নয়, বরং একটি সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ।
কবি, সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রাজু আলীমের সঙ্গে এক দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি কর্পোরেট দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি রাষ্ট্র, অর্থনীতি, নেতৃত্ব ও সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন।
আলোচনার শুরুতেই নিজেকে ‘টপ কর্পোরেট পারসন’ হিসেবে দেখার ধারণা নাকচ করেন সাব্বির হাসান নাসির। তিনি বলেন, নিজেকে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেই দেখেন এবং তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দায়িত্ব পালন।
তিনি জানান, তার কর্পোরেট ভিশন হলো বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করা, বা এনরিচ লাইফ অফ বাংলাদেশি পিপল।
স্বপ্নকে তিনি কেবল একটি সুপারমার্কেট চেইন হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে দেখেন। প্রতিষ্ঠানটিকে বিনিয়োগযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য পূরণের অংশ হিসেবে জাপানি প্রতিষ্ঠান মিসংকোর বিনিয়োগকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন তিনি।
এই বিনিয়োগ একটি কনভার্টেবল লোন হিসেবে শুরু হয়ে ভবিষ্যতে ইকুইটিতে রূপ নিতে পারে। এর মাধ্যমে মূলধনের পাশাপাশি প্রযুক্তি, অপারেশনাল দক্ষতা ও লজিস্টিকস উন্নয়নে সহযোগিতা মিলবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সাব্বির হাসান নাসির মনে করেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের সঠিক চিত্র এখনো তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। অনেকেই দেশটিকে শুধু গার্মেন্টসনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে দেখেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে বিনিয়োগবান্ধব ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য একটি কার্যকর ‘ক্যাপিটাল ব্রিজ’ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি, যা বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মধ্যে বিনিয়োগ সংযোগ বাড়াবে।
‘স্বপ্ন’-এর ব্যবসায়িক মডেল নিয়েও তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। এখানে বিনিয়োগকারীরা মূলধন দেন, কিন্তু পরিচালনার দায়িত্ব থাকে প্রতিষ্ঠানের হাতে। ফলে ঝুঁকি কমে এবং কর্মসংস্থান বাড়ে।
এই মডেলের মাধ্যমে ছোট বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করে বড় খুচরা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ ও সাধারণ মানুষের কষ্টের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ট্রাক সেল বা ভ্রাম্যমাণ বিক্রির মাধ্যমে কম দামে পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। এটি শুধু ব্যবসা নয়, বরং বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙার একটি প্রয়াস বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রচলিত বাজারব্যবস্থাকে অগোছালো উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি, মান নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।
সংগঠিত খুচরা বাজার গড়ে তুললে ভোক্তারা নিরাপদ ও মানসম্পন্ন পণ্য পাবেন বলে মত দেন তিনি। বিশেষ করে নারী ক্রেতাদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখেন।
ভবিষ্যৎ কৌশল হিসেবে তিনি জানান, একদিকে বড় সুপারস্টোর, অন্যদিকে বাসার কাছাকাছি ছোট আউটলেট বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করে উৎপাদন থেকে বিক্রয় পর্যন্ত সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশকে তিনি একটি বিপ্লবের ফল হিসেবে উল্লেখ করে ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার মূল চেতনা ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক ন্যায়—এই মূল্যবোধ ধরে রেখেই সামনে এগোতে হবে।
দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান তুলে ধরে তিনি বলেন, রেমিট্যান্স একটি বড় ভিত্তি হলেও শ্রমিকদের সুরক্ষা ও সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি। অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর জোর দেন তিনি।
সাব্বির হাসান নাসির বলেন, উন্নয়নের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক অধিকার সংকোচন ও দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ উদ্বেগজনক। তিনি মনে করেন, কোনো নেতৃত্বই স্থায়ী নয়। তাই ক্ষমতায় থাকাকালে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব রাখার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে বেকারত্বকে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান বাড়াতে না পারলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খারাপ হতে পারে। সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আলোচনার শেষদিকে তিনি বলেন, ব্যবসা শুধু মুনাফার বিষয় নয় এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব। তার ভাষায়, নেতৃত্ব, ব্যবসা বা রাষ্ট্র সব জায়গায় স্থায়িত্ব নয়, দায়িত্বই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই দায়িত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষকে।








