কৃষি

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে সয়াবিন বাজারে অস্থিরতা, চাপে বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও জ্বালানি সংকটে বৈশ্বিক বাজার অস্থির

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে সয়াবিন বাজারে অস্থিরতা, চাপে বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রভাবে আন্তর্জাতিক সয়াবিন বাজারে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে, বিশেষ করে বাংলাদেশে। সয়াবিনের মূল্য ২০ মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিলের মার্কেট ইন্টিলিজেন্সের মার্চ ২০২৬ এর প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে সয়াবিন আবাদ বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সয়াবিনের মূল্য ২০ মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা মূলত জ্বালানি খাতে বায়োফুয়েলের চাহিদা বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে হয়েছে। প্রতি বুশেল সয়াবিনের দাম ১২ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্ববাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সরাসরি প্রভাব ফেলছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। চীন, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সয়াবিন আমদানিকারক, তাদের আমদানি বেড়েছে। তবে ব্রাজিলের দেরিতে ফসল সংগ্রহ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যার কারণে বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতি এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। স্ট্রেইট অব হরমুজ কার্যত অচল হয়ে পড়ায় তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং জ্বালানির দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮–১১৬ ডলারের মধ্যে উঠানামা করছে।

এর ফলে শুধু জ্বালানি নয়, কৃষিপণ্যের পরিবহন খরচও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেল ও খাদ্যশস্যের দাম বাড়ার পেছনে এই জ্বালানি সংকট একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য কী ঝুঁকি?

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি-নির্ভর দেশগুলো এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পেট্রোলিয়াম পণ্যে রেশনিংয়ের মতো পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে।

বিশেষ করে কাতার থেকে আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহ হুমকির মুখে পড়তে পারে, যদি হরমুজ প্রণালীর সংকট দীর্ঘায়িত হয়। এতে দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একই সঙ্গে ভোজ্যতেলের বাজারেও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজারে আতঙ্কজনিত কেনাকাটা এবং মজুত করার প্রবণতা ইতোমধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকটকে আরও তীব্র করতে পারে।

এ বিষয়ে ইউসেক বাংলাদেশ লিড খাবিবুর রহমান কাঞ্চন চ্যানেল আইকে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সয়াবিন আমদানি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের আগেই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ায় বাংলাদেশ কিছুটা সুবিধা পাবে।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

বিশ্বব্যাপী সয়াবিন উৎপাদন মোটামুটি স্থিতিশীল থাকলেও, কিছু অঞ্চলে উৎপাদন কমার আশঙ্কা রয়েছে। আর্জেন্টিনায় খরার প্রভাব এবং ইউক্রেনে উৎপাদন হ্রাসের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।

এদিকে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে সয়াবিনের ওপর নির্ভরশীল পোলট্রি ও খাদ্যশিল্পে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ফিডের দাম বৃদ্ধির ফলে ডিম, মুরগি ও মাছের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন

ব্রাজিলে নতুন স্যানিটারি নীতিমালার কারণে চীনে সয়াবিন রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে একটি বড় বহুজাতিক কোম্পানি। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। কন্টেইনার ভাড়া এবং শিপিং খরচ বৃদ্ধির ফলে আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

সামনে কী হতে পারে?

বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।

তাদের মতে, বিকল্প জ্বালানি উৎস, সরবরাহের বহুমুখীকরণ এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা যে কেবল একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়, বরং তা সরাসরি বাংলাদেশের রান্নাঘর থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যন্ত বিস্তৃত; সেই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিষয়:আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এলএনজি সংকট খাদ্য নিরাপত্তা জ্বালানি সংকট তেলের দাম বাংলাদেশ অর্থনীতি

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…