২০১৬-এর জানুয়ারিতে ঢাকায় এসডিজি অর্জন বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সংসদের স্পিকারদের সম্মেলনে সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে ‘তামাকমুক্ত বাংলাদেশ’ গড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা কেবল জনহিতকর নয় বরং খুবই সময়োচিতও বলতে হবে।
কেননা ১৫ বছর বা তদুর্ধ্ব বয়সী নাগরিকদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতার বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে একটি। তামাকজনিত কারণে বছরে সোয়া এক লক্ষ নাগরিক মৃত্যুবরণ করছেন। তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ। সময়োচিত ঐ নির্দেশনা দেয়ার সময়েই প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে, তামাকমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্য অর্জনের জন্য সিগারেটসহ অন্যান্য তামাক পণ্যের জন্য কর-কাঠামো এমনভাবে সংস্কার করা হবে যাতে করে দেশে এসব ক্ষতিকারক পণ্যের সহজলভ্যতা কমে কিন্তু এখান থেকে আসা করের পরিমাণ আকস্মিকভাবে কমে না যায়।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য সে সময় থেকেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতি বছর বাজেটে সিগারেটের খুচরা মূল্য বাড়িয়ে আসছে। রাজস্ব বোর্ডের এসব পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, প্রতি বছর সিগারেটের দাম যে মাত্রায় বাড়ানো হচ্ছে আমাদের মাথাপিছু আয় তার চেয়ে বেশি হারে বেড়ে চলেছে। আর মূল্যস্ফীতি তো রয়েছেই। ফলে বলা চলে সিগারেটের দাম প্রকৃত অর্থে খুব বাড়ছে না। ফলে এগুলো সহজলভ্যই থেকে যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের কিশোর-তরুণরাই। কম দামে সিগারেট বাজারে পাওয়া যায় বলে তারা সহজেই এই ক্ষতিকারক পণ্যটি ব্যবহার করতে পাচ্ছে।
সমতুল্য অন্য অনেক দেশের তুলনায় আসলেই বাংলাদেশে সিগারেট অনেক সস্তা। ২০২১ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অন দ্যা টোব্যাকো প্যানডেমিক-এর তথ্য মতে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া সিগারেটের ২০-শালাকার এক প্যাকেটের দাম প্রতিবেশী ভূটানের তুলনায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং শ্রীলঙ্কার তুলনায় দশ ভাগের এক ভাগ। সহজলভ্য ক্ষতিকারক পণ্য সিগারেটের থেকে কিশোর-তরুণদের রক্ষা করতে তাই দেশের তামাক-বিরোধী নাগরিক সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষকদের সঙ্গে কাজ করে আসন্ন বাজেটে বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের দাম উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়ানোর প্রস্তাব সামনে এনেছে।
সম্প্রতি আমি বিয়াম মিলনায়তনে একটি বেসরকারি সংগঠন আয়োজিত ‘সিগারেটের ওপর কার্যকর করারোপ’ বিষয় একটি জাতীয় সংলাপে অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেখানে সাবেক মন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন নীতি নির্ধারক এবং বিষয় বিশেষজ্ঞ ছিলেন। চমৎকার ওই আয়োজনে না গেলে বুঝতেই পারতাম না সিগারেট বা তামাকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির কলেবর বা রুপটা কেমন। তবে চলাফেরার পথেও বুঝতে পারি সিগারেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের নতুন প্রজন্ম আসক্তি যেন ক্রমশই বাড়ছে। অনেক জায়গাতে দেখতে পাই কলেজ বা স্কুলের ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের হাতে সিগারেট। সিগারেট টানছে অবলীলায়। অনেকেই আবার ক্লাসরুমে ঢোকার আগে ধূমপান করে যাচ্ছে। এরকম দৃশ্য সব শহরেই দেখা যায়। এরকম দৃশ্য দেখার পর মন খারাপ না হয়ে পারে না। আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য এই দৃশ্য খুব ভালো কিছুই নয়। কমবয়সীদের সিগারেট খাওয়া বড় বেশি পীড়া দেয় আমাকে। সবসময় তাই মনে হয় একটা নিয়ম কানুনের মধ্যে আনা গেলে এই প্রবণতা, এই আসক্তি কমিয়ে আনা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
গবেষণা সংগঠন উন্নয়ন সমন্বয়ের প্রদত্ত তথ্যমতে, বিভিন্ন স্তরের সিগারেটের মধ্যে সবচেয়ে সস্তা হলো নিম্ন স্তরেরগুলো। বাজারে মোট যা সিগারেট বিক্রি হয় তার ৭০ শতাংশই এই স্তরের। কময়বয়সীরা প্রধানত এই স্তরের সিগারেটই বেশি ব্যবহার করে থাকে। বর্তমানে এই স্তরের সিগারেটের দশ-শলাকার একেকটি প্যাকেটের দাম ৪৫ টাকা। আসছে বছরে এই দাম বাড়িয়ে ৬০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাতে বর্তমানে যে কিশোর-তরুণরা সিগারেট ব্যবহার করছে তাদের ধূমপানের হার যেমন কমবে, তেমনি ঐ বয়সীদের মধ্যে নতুন করে সিগারেট খাওয়া শুরু করার সম্ভাবনাও কমবে। তবে এতে সিগারেট থেকে আসা রাজস্বে যেন কোন চাপ না পড়ে সে দিকটিতেও লক্ষ্য রাখা হয়েছে। নিম্ন স্তরের সিগারেটের ওপর বর্তমানে ৫৮ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা আছে। তামাক-বিরোধী নাগরিক সংগঠনগুলোর প্রস্তাবনায় এই হার বাড়িয়ে ৬৩ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। এই স্তরের সিগারেটের ওপর ভ্যাট ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ অবশ্য আগের মতোই যথাক্রমে ১৫ শতাংশ ও ১ শতাংশ রাখা হয়েছে।
বর্তমানে নিম্ন স্তরের সিগারেটের প্রতি দশ-শলাকা বিক্রি থেকে সরকার ৩৩ টাকা ৩০ পয়সা কর পাচ্ছে। তামাক-বিরোধী নাগরিক সংগঠনগুলোর প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন হলে এই টাকার পরিমাণ বেড়ে ৪৭ টাকা ৪০ পয়সা করা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ বাড়তি ১৪ টাকা ১০ পয়সা কর পাওয়া যাবে। তামাক-বিরোধী নাগরিক সংগঠনগুলোর প্রস্তাবনায় অন্যান্য স্তরের সিগারেটের ওপর সম্পূরক শুল্ক হার, ভ্যাট ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আগের মতোই রাখা হয়েছে। তবে প্রতি প্যাকেটের খুচরা মূল্য ঠিকই বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। দাম বাড়ানো গেলে করহার পরিবর্তন না হলেও মধ্যম, উচ্চ, ও প্রিমিয়াম স্তরের দশ-শলাকার প্রতি প্যাকেট বিক্রি থেকে সরকার বর্তমানের তুলনায় যথাক্রমে বাড়তি ১১ টাকা, ১৪ টাকা ও ১৬ টাকা কর পাওয়া যাবে। মোট হিসাবে তামাক-বিরোধী নাগরিক সংগঠনগুলোর প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন করা গেলে আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাড়তি ১০ হাজার কোটি টাকা (২৮ শতাংশ) কর পাওয়া সম্ভব বলে প্রাক্কলন করা গেছে। এই প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের ফলে কেবল বাড়তি রাজস্ব আসবে তাই নয়, বরং সিগারেট ব্যবহারের হার আগের চেয়ে ৯ শতাংশ কমবে, ১০ লক্ষ কিশোর-তরুণকে ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত রাখা যাবে, সর্বোপরি প্রায় ১১ লক্ষ অকালমৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হবে।
এসব কারণে গণমাধ্যমে প্রচারিত তামাক-বিরোধী নাগরিক সংগঠনের প্রস্তাবনাগুলো ইতোমধ্যেই নীতিনির্ধারকসহ সর্বস্তরের অংশীজনদের কাছে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও এই প্রস্তাবনাগুলোকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে আসন্ন বাজেটে এগুলো প্রতিফলিত করবে। আমি মনে করি সিগারেটের যে বিপুল ব্যবহার এটি কমিয়ে আনতে সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। আমরা জানি রাতারাতি কোনোকিছুই করা সম্ভব নয়। তবে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য আমাদের প্রতিনিয়ত কথা বলতে হবে, সবাইকে সচেতন করতে হবে। আবার নিয়মনীতি ও আইন কানুনের মধ্যে আনতে হবে। আইনের প্রয়োগও করতে হবে। আগামী প্রজন্মের সুরক্ষায় সম্মিলিতভাবে আসলে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে। ‘আমি ভাল আছি’ এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। এই দেশ সবার, সব মানুষের। সবার জন্য চাই সুরক্ষা। আর নতুন প্রজন্মের জন্য সেই সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে আরও বেশি করে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








