ভারতে একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাবেক সংবাদপত্র সম্পাদককে ভোটাধিকার এবং পাসপোর্ট-সংক্রান্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশটির শীর্ষ সাংবাদিক সংগঠন।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ভারতের এডিটরস গিল্ড অব ইন্ডিয়া রোববার (২৮ জুন) এক বিবৃতিতে জানায়, সাবেক সম্পাদক আর রাজাগোপালের ঘটনা প্রমাণ করে, বিতর্কিত স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) কর্মসূচির কারণে লাখো ভারতীয় ভোগান্তির মুখোমুখি হচ্ছেন।
সাবেক সম্পাদক আর রাজাগোপাল, যিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, জানিয়েছেন যে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে তার নাম বাদ পড়ার পর তার পাসপোর্ট নবায়নের প্রক্রিয়াও আটকে গেছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) অযোগ্য ভোটার শনাক্ত করার লক্ষ্যে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) কর্মসূচি পরিচালনা করছে। তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় ভুলভাবে কোটি কোটি বৈধ ভোটারের নামও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে নির্বাচন কমিশন।
এডিটরস গিল্ড বলেছে, রাজাগোপালের মতো একজন পরিচিত জনপরিসরের ব্যক্তির যদি ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে রাজাগোপালের অভিযোগের বিষয়ে ভারতীয় নির্বাচন কমিশন এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে শুধু পশ্চিমবঙ্গেই বাদ পড়েছে প্রায় ৯০ লাখ নাম। রাজাগোপালসহ হাজারো মানুষ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আবেদন করেছেন।
বর্তমানে আরও ১৬টি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপ চলছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে রাজাগোপাল লিখেছেন, তিনি ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে কলকাতার বালিগঞ্জ বিধানসভা এলাকায় বসবাস করলেও ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তার বা তার বাবার নাম না থাকায় বর্তমান তালিকা থেকে তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় বর্তমান ভোটার তালিকার সঙ্গে ২০০২ সালের জাতীয় ভোটার তালিকার তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। সেটিই ছিল সর্বশেষ দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা।
রাজাগোপাল জানান, তিনি ২০১০ সাল থেকে নিয়মিত ভোটার এবং সাত বছর *দ্য টেলিগ্রাফ*-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপরও তার দেওয়া মাধ্যমিক পরীক্ষার সনদ গ্রহণ করা হয়নি এবং কোনো কারণ না জানিয়েই তার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি লিখেছেন, “ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দেওয়ার কোনো কারণ জানানো হয়নি। আমি মাধ্যমিকের সনদ জমা দেওয়ার পরও কোনো ব্যাখ্যা পাইনি। বর্তমানে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত একটি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন।”
রাজাগোপালের দাবি, পরে কর্তৃপক্ষ তাকে জানিয়েছে যে ভোটার তালিকায় তার নাম না থাকায় পাসপোর্ট নবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, “আমি বিস্মিত হয়েছি। কারণ কোথাও এমন কোনো সরকারি নথি পাইনি যেখানে বলা হয়েছে যে পাসপোর্ট নবায়নের জন্য ভোটার পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক।”
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি।
রাজাগোপালের ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাংবাদিক, বিরোধী দলের নেতা ও বিভিন্ন মহল তার প্রতি সংহতি জানিয়ে ভোটাধিকার পুনর্বহালের দাবি তুলেছেন।
প্রবীণ সাংবাদিক রাজদীপ সারদেসাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “আমি রাজাগোপালের পাশে আছি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এটি যে কারও সঙ্গে ঘটতে পারে।”
কংগ্রেসের মুখপাত্র সুপ্রিয়া শ্রীনাতে অভিযোগ করেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং জবাবদিহিতা দাবি করার কারণেই রাজাগোপালকে এই মূল্য দিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)-এর সাধারণ সম্পাদক **এম এ বেবি** বলেন, তাদের দল আগেই সতর্ক করেছিল যে এসআইআর কর্মসূচির ফলে দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন,”এখন দেখা যাচ্ছে, আর রাজাগোপালের মতো একজন খ্যাতিমান সম্পাদক ও স্বনামধন্য সাংবাদিককেও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।”







