মার্কিন নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে যে মাতামাতি হচ্ছে, তা অপ্রাসঙ্গিক। মার্কিন রাজনীতিতে পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং পরিস্থিতি তাতে কোনো প্রভাবিত হয় না; দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও শাসনব্যবস্থা রয়ে যায় একই রকম। আমরা যারা পরিবর্তন চেয়েছি, জুলাইয়ের আন্দোলনে সেই আকাঙ্ক্ষা প্রবলভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। সর্বস্তরের মানুষই উন্নয়ন এবং সুশাসনের প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা সেই স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। তাই মার্কিন বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে দেশে কোনো আন্দোলন হলেও হয়তো সেই সমর্থন পাওয়া সম্ভব নয়।
ড. ইউনূসের মতো ব্যক্তিত্ব সরকার পরিচালনার দায়িত্বে আসুক, এমন ইচ্ছা আমারমত অনেকেরই ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, এমন একটি সরকার গঠন হলেও তার টিকে থাকা কঠিন হবে। অতীতের সরকারগুলো যেমন লাগামহীন ক্ষমতাচর্চা, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং জনগণের অধিকার দমনের মাধ্যমে দেশের শাসনব্যবস্থাকে বাজেভাবে ব্যবহার করেছে, তারই প্রভাবে আমরা দেখেছি ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনেও একই রকম প্রতিহিংসার রাজনীতি চলছে। আওয়ামী লীগের মতো একটি দল, যারা স্বাধীনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই দলের এমন পরিণতি সত্যিই দুঃখজনক। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সর্বদলের অংশগ্রহণে হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু এখানেও বিদ্বেষের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান আমাদের শঙ্কিত করছে। শেখ হাসিনা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি সম্পর্কে যা বলেছেন, তার কিছু সত্যতা রয়েছে। তবে স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুকে কেবল আওয়ামী লীগের নিজের সম্পত্তি বলে দাবি করা এবং অন্যান্য নেতাদের অবমূল্যায়ন করাই দলের জন্য সংকট সৃষ্টি করেছে। এখন যারা দেশের দায়িত্বে আছেন, তারা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের পক্ষে কথা বলছেন, যা আমাদের দেশকে একটি অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকই তাদের বিভিন্ন অন্যায়ের জন্য বিচার পাবার যোগ্য, তবে সেই বিচার প্রতিহিংসাপ্রবণ হওয়া উচিত নয়, যে নিরীহ ব্যক্তিরা শাস্তি পাবে। অলরেডি প্রতিদিনই প্রায় নানান জায়গা মবের অত্যাচার দেখা যাচ্ছে। সামনে নির্বাচন হলেও হয়তো আওয়ামী লীগ এমনিতেই ৫ থেকে ১০ বছরের অনেক দূরে পড়ে থাকবে। তবে প্রকৃত অপরাধীদের বিচার একপক্ষীয় হওয়া উচিত নয়, সকল হিংসাত্মক ও অবৈধ কার্যক্রমের বিচার হওয়া আবশ্যক। গণতান্ত্রিক পন্থায় সুষ্ঠু নির্বাচনই দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে।
গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, সেটাই দেশের জন্য মঙ্গল হবে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আর ধর্ম দুটাই যথেষ্ট সংবেদনশীল, এগুলা ব্যবসা বা ক্ষমতার জন্য নহে। বিএনপির উচিত তাদের অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নতুনভাবে ফিরে আসা, যদিও বিভিন্ন দলীয় নেতাদের অপরাধের শাস্তি হিসেবে বহিস্কার করছে, এটা ভালো সাইন। আওয়ামী লীগও নিজেদের ভুল স্বীকার করে, শুদ্ধির পথে ফিরে আসুক।
মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং ধর্ম, এই সবগুলোই আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের সাথে সম্পৃক্ত ও অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এ ধরনের বিষয়কে রাজনৈতিক ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। বিএনপির তাদের অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে, একটি সঠিক পথে দেশ পরিচালনায় এগিয়ে আসুক। ইতোমধ্যে দলীয় নেতাদের অপরাধের শাস্তি হিসেবে বহিষ্কার করার মাধ্যমে যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা একটি ইতিবাচক দিক নির্দেশ করছে। আমরা একটি গঠনমূলক, মানবিক এবং ন্যায়ের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত দেশ চাই, যেখানে কোনো ধরনের প্রতিহিংসা থাকবে না এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দেশ পরিচালিত হবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








