মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্তও কার্যকর হয়েছে। তবে চুক্তি নিয়ে সংরক্ষিত অবস্থান জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি।
বিবিসি জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বিবৃতিতে জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশ অনুযায়ী ইরানের বিরুদ্ধে কার্যকর থাকা নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে অবরোধ বাস্তবায়নে মার্কিন বাহিনীর কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে।
চুক্তি প্রসঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেন, শুরুতে তিনি এই সমঝোতার পক্ষে ছিলেন না। তবে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের আশ্বাসের পর তিনি এতে সম্মতি দেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মরিয়া হয়েই এই চুক্তিতে পৌঁছাতে চেষ্টা করেছেন।
চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সব ফ্রন্টে অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া। এছাড়া ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়েও কঠোর প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, চুক্তি কার্যকর হলেও ইরান তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে না। তিনি বলেন, ইরানকে প্রথমে প্রমাণ করতে হবে যে তারা চুক্তির শর্ত মেনে চলছে এবং তাদের আচরণে বাস্তব পরিবর্তন এসেছে।
সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী, ইরানকে তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করতে হবে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জন্য অর্থায়ন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতিও দিতে হবে। এসব শর্ত পূরণের পরই নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভ্যান্স জানান, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরবর্তী ৬০ দিন উভয় পক্ষের মধ্যে কারিগরি ও কূটনৈতিক আলোচনা চলবে। এ উদ্দেশ্যে তিনি শিগগিরই সুইজারল্যান্ড সফর করতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দেন। তবে সফরের সম্ভাব্য তারিখ তিনি জানাননি।
মূলত শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। কিন্তু মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান জানিয়েছে, দূরবর্তী প্রক্রিয়ায় চুক্তি স্বাক্ষর সম্পন্ন হওয়ায় নির্ধারিত অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। যদিও পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনার জন্য দুই দেশের প্রতিনিধিরা সুইজারল্যান্ডে বৈঠকে বসতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক লিখিত বিবৃতিতে মোজতবা খামেনি বলেন, চুক্তি প্রণয়নে যুক্ত কর্মকর্তারা আন্তরিক উদ্বেগ ও সদিচ্ছা থেকে কাজ করেছেন। তবে তিনি এ বিষয়ে নিজের ভিন্ন মত থাকার কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিলেও তিনি স্পষ্ট করেন, এর অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান মেনে নেওয়া নয়।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এরপর মার্চ মাসে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই চুক্তি নিয়ে এটিই তাঁর প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্য।
চুক্তি নিয়ে এখনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া না দিলেও ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে আশা প্রকাশ করেছেন যে লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলো শান্তি আলোচনার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখবে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় ওয়াশিংটন ইসরায়েলের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল।







