দীর্ঘ ৭ বছর পর ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক মিশন পুনরায় চালুর লক্ষ্যে দেশটির শীর্ষ মার্কিন দূত লরা ডোগু কারাকাসে পৌঁছেছেন। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে নিজের আগমনের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমার দল ও আমি কাজ শুরু করতে প্রস্তুত।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
এই পদক্ষেপটি আসে প্রায় এক মাস পর, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে কারাকাসের প্রেসিডেনশিয়াল প্যালেস থেকে ধরে নিয়ে যায়। পরে তাকে নিউইয়র্কের একটি কারাগারে নেওয়া হয়। সেখানে তার বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও ‘নার্কো-সন্ত্রাসবাদে’ ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে ব্যাপকভাবে সমালোচনা করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল টেলিগ্রামে জানান, তিনি লরা ডোগুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে একটি ‘রোডম্যাপ’ তৈরির পাশাপাশি বিদ্যমান মতপার্থক্য কূটনৈতিক সংলাপ ও পারস্পরিক সম্মান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর আগে হন্ডুরাস ও নিকারাগুয়ায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা লরা ডোগুকে ভেনেজুয়েলায় অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ইউনিটটির কার্যক্রম পরিচালিত হয় কলম্বিয়ার বোগোতায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে।
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। সে সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেন। গুয়াইদো ওই বছরের জানুয়ারিতে নিজেকে দেশের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছিলেন।
ভেনেজুয়েলার প্রভাবশালী রাজনীতিক ও মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো চলতি বছরের জানুয়ারিতে বলেন, কারাকাসে মার্কিন দূতাবাস পুনরায় চালু হলে অপসারিত প্রেসিডেন্ট মাদুরোর সঙ্গে আচরণ পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবে ভেনেজুয়েলা সরকার।
যদিও ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে মাদুরোকে ধরে নেওয়া প্রয়োজন ছিল, তবে কর্মকর্তারা বারবার ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ তাদের প্রধান আগ্রহের বিষয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়।
মাদুরোকে আটক করার পর অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ওপর চাপ বাড়ান ট্রাম্প, যাতে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল খাত মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
এরই মধ্যে দুই দেশ সর্বোচ্চ ২০০ কোটি ডলারের ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার রদ্রিগেজ একটি সংস্কার বিল আইনে স্বাক্ষর করেন, যা বেসরকারিকরণ আরও বাড়ানোর পথ খুলে দেবে।
নতুন আইনে ভেনেজুয়েলার তেলের উৎপাদন ও বিক্রির নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি কোম্পানির হাতে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইনি বিরোধ ভেনেজুয়েলার আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে যা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি কোম্পানিগুলোর দাবি ছিল। তারা অভিযোগ করে আসছে, দেশের বিচারব্যবস্থা শাসক সমাজতান্ত্রিক দলের প্রভাবাধীন।
এ ছাড়া সরকার যে রয়্যালটি আদায় করতে পারবে, তার সর্বোচ্চ হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ শতাংশ।
একই দিনে ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, তারা ভেনেজুয়েলার তেল খাতে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং নির্দিষ্ট কিছু রপ্তানি কার্যক্রমের জন্য সরকার ও রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-কে সীমিত লেনদেনের অনুমতি দেবে, যেখানে একটি ‘প্রতিষ্ঠিত মার্কিন প্রতিষ্ঠান’ যুক্ত থাকবে।
ট্রাম্প আরও ঘোষণা দেন, তিনি ভেনেজুয়েলার বাণিজ্যিক আকাশসীমা পুনরায় খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং রদ্রিগেজকে ‘অবহিত’ করেছেন যে শিগগিরই মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো সম্ভাব্য প্রকল্প অনুসন্ধানে দেশটিতে আসবে।
শুক্রবার রদ্রিগেজ শত শত বন্দিকে মুক্তির লক্ষ্যে একটি সাধারণ ক্ষমা বিলের ঘোষণা দেন। পাশাপাশি তিনি কারাকাসের কুখ্যাত গোপন কারাগার এল হেলিকোইদে বন্ধ করে সেখানে একটি ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনের কথা জানান।
এই পদক্ষেপটি ভেনেজুয়েলার বিরোধী পক্ষের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল।







