চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

উবারের ‘সুপার ড্যাড’ হলেন যারা

নানা পেশার মানুষজন যোগ দিচ্ছে রাইডশেয়ারিং প্লাটফর্ম উবারে। পরিবারের মানুষদের গ্রামে রেখে এসে শহরে একা কাজ করা মানুষদের মধ্যে রয়েছেন এ পেশার অনেকেই।

বিশ্ব বাবা দিবস উপলক্ষে উবার খুঁজে বের করেছে সেসব রাইডারদের যারা বাবা হিসেবে নিজেদের গুরুত্ব বুঝতে পারেন। উবার রাইডের মাধ্যমে সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও লেখাপড়ার বিষয় নিশ্চিন্ত করে যাত্রীদের প্রতিও নির্ভরযোগ্যতা ও দায়িত্বশীলতার হাত বাড়িয়ে দেন।

Reneta June

স্বামী ও তিন সন্তানের বাবা আরিফ পাটোয়ারি এমনই একজন, যিনি চাঁদপুরে থাকা পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের জন্য ঢাকায় কষ্ট করে যাচ্ছেন। এর আগে তিনি দেশের বাইরে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। দেশে ফেরার পর বন্ধুদের মুখে উবারের প্রশংসা শুনে তিনি এই প্ল্যাটফর্মে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

বিজ্ঞাপন

আরিফ বলেন, “আমি যদি বিদেশে বা দেশের কোনো কোম্পানিতে কাজ করতাম, আমার স্ত্রী-সন্তানদের সাথে দেখা করা আমার জন্য অসম্ভব হতো। এখন আমি এক সপ্তাহ পর পর বা প্রয়োজনমতো তাদের দেখে আসতে পারি।”

একজন বাবা হিসেবে আরিফ নিজের দায়িত্বের গুরুত্ব বুঝতে পারেন এবং তা পূরণ করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন।

একবার সকালবেলায় একটি ছোট ছেলে তাকে কল করলো। ছেলেটির পরীক্ষা ছিল, কিন্তু পরীক্ষাকেন্দ্র অনেক দূরে হওয়ায় সে কোনো গাড়ি পাচ্ছিল না। আরিফ এই পরিস্থিতির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং ছেলেটিকে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ৪.৯ রেটিং নিয়ে কঠোর পরিশ্রমী আরিফ প্রায় ১৫ হাজার ট্রিপ সম্পন্ন করেছেন।

ঢাকা ইপিজেডের একটি কোম্পানিতে কাজ করতেন উবারের আরেক চালক মো. গিয়াস উদ্দিন। পাঁচ বছর আগে, নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে, একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি উবারে যোগ দেন। গিয়াসের মতো চালকদের জন্য উবার একটি আকর্ষণীয় ও লোভনীয় প্ল্যাটফর্ম বলে মনে হয়েছিল তার। গিয়াস তিন সন্তানের বাবা। সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করা তার জন্য জরুরি ছিল। তার বড় ছেলে ফিলিপাইনে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, বড় মেয়ে এমবিবিএস শিক্ষার্থী এবং ছোট মেয়ে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে।

গিয়াস জানান, “উবার না থাকলে আমার ছেলে-মেয়েদের বেড়ে ওঠার বিষয়ে কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারতাম না।”

তার মতে, উবারে তিনি নিজের পছন্দমতো সময়ে কাজ করতে পারেন, ফলে নিজের পরিবারের সাথে তার বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছে।

একজন বাবা হিসেবে তিনি নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন, এবং যাত্রীদের জন্য বাড়তি কিছু করার মাধ্যমে এর প্রমাণ তিনি দিয়ে আসছেন। একবার এক উদ্বিগ্ন ব্যক্তির কাছ থেকে কল পেলেন গিয়াস। ঐ ব্যক্তির বাচ্চার টিকা দিতে হবে, কিন্তু তিনি কোনো গাড়ি পাচ্ছিলেন না। একজন বাবা হিসেবে গিয়াস পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারলেন। তিনি তাদের সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে গেলেন, পরে তাদের বাসায়ও পৌঁছে দিলেন।

এছাড়াও, তিনি ১০০-র বেশি মানুষকে জরুরি বা অসুস্থ অবস্থায় সাহায্য করেছেন। নিজের পরিবারের মতো অন্যদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত জটিলতা নিয়েও তিনি সচেতন। এমন আচরণের জন্য উবারে তার রেটিং ৪.৭। পাশাপাশি, তিনি ১৫ হাজার ৬৯৩টি ট্রিপ সম্পন্ন করেছেন, অর্থাৎ বছরে তার ট্রিপের সংখ্যা প্রায় ৩,০০০টি এবং দিনে প্রায় ১০-১৪টি।

সন্তানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো সম্ভবত বাংলাদেশের প্রত্যেক বাবা-মায়েরই স্বপ্ন। উবারের অন্যতম সেরা চালক নিজাম উদ্দিনের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তার বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষে পড়ছে। তার ছেলে কমার্স কলেজের শিক্ষার্থী এবং তার ছোট মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী।

নিজাম ও তার স্ত্রী সন্তানদের লালনপালনের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছেন। নিজাম ঘরের বাইরে তাদের ভরণপোষণের জন্য অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত থাকেন, আর তার স্ত্রী সন্তানদের লেখাপড়া ও অন্যান্য দিক সামলান।

নিজাম একজন বাবা, যিনি পরিবারের চাহিদা মেটাতে ও সন্তানদের উন্নত জীবন দিতে কঠোর পরিশ্রম করেন, নিজের সুখের কথাও চিন্তা করেন না। তার এই আচরণ সব কঠোর পরিশ্রমী বাবাদের চিত্রই তুলে ধরে। ঈদের মতো বিশেষ দিনেও তিনি পরিবারের সাথে সময় না কাটিয়ে তাদের জন্য অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত থাকেন। ৪.৮৩ রেটিং নিয়ে নিবেদিত এই ড্রাইভার-পার্টনার এখন পর্যন্ত ১৪,৬৫০টি ট্রিপ সম্পন্ন করেছেন।

একটি স্থানীয় বাস সার্ভিস কোম্পানিতে কাজ করতেন উইলিয়াম তালুকদার। বাস মালিক ও যাত্রীদের বাজে ব্যবহারের কারণে তিনি সেই কাজ ছেড়ে উবারে যোগ দেন। শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পেরে তিনি তার ছেলেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করান। ও লেভেল উত্তীর্ণ হয়ে সেই ছেলে এখন টেক্সটাইলসে পড়াশোনা করছে।

তালুকদার চান নিজের গাড়ি কিনে উবার চালাতে এবং পরিবারের জন্য আরও বেশি উপার্জন করতে। উবারের সাথে তার চমৎকার যাত্রায় তিনি এখন পর্যন্ত ১৫,০০০ এর বেশি ট্রিপ সম্পন্ন করেছেন। তার ছেলেকে উবারের বিভিন্ন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেও তিনি নিয়ে গেছেন।