এক সপ্তাহ আগে তুরস্ক এবং সিরিয়ার বুকে আঘাত হানা ভূমিকম্পে প্রাণ হারাচ্ছে হাজারও মানুষ। তবে সেখানে এই ভয়াবহতার মাঝে আছে বেঁচে ফেরার ঘটনাও।
এমনই এক ঘটনা নেকলা কামুজ এর। বিবিসি জানায়, নবজাতক ছেলেসহ মৃত্যুকূপ থেকে ফিরেছে তার পরিবার। ঘটনার মাত্র ১০ দিন আগে ২৭ জানুয়ারি নেকলার দ্বিতীয় ছেলের জন্ম হয় এবং নাম দেন ইয়াগিয, যার অর্থ ‘সাহসী’।
ভূমিকম্পের দিন স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ১৭ মিনিটে নেকলা সজাগ ছিলেন, তার নবজাতককে দুধ খাওয়াচ্ছিলেন। তুরস্কের হাতায় প্রদেশের একটি ৫ তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় থাকতেন তারা। ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সাথে সাথে নেকলা অপর রুমে থাকা তার স্বামী এবং তিন বছরের ছেলে ইজিট এর কাছে যেতে চাচ্ছিলেন। একই সময় তারাও অপর রুম থেকে তার কাছে আসছিলেন। ঠিক এমন সময় তার ছেলে এবং স্বামীর উপর ছাদের সিলিং ভেঙে পড়ে।
নেকলা বলেন, ‘আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক আঘাতে ধুলায় মিলিয়ে গেলাম। তখনও আমার বুকে আমার নবজাতক ছেলে ইয়াগিয। হঠাৎ আমার আলোকিত পৃথিবী ধূসর অন্ধকারে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। যখন কিছুটা বুঝে ওঠা শুরু করলাম তখন বুঝলাম আমাদের পাশে থাকা এক ওয়্যাড্রবের জন্য আমি এবং আমার ছেলে প্রাণে বেঁচেছি।
আটকা পড়ার প্রথম দিন
আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না ধুলাবালির জন্য। কিছু সময় পর ধুলাবালি কমায় স্বাভাবিক নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম। আমি আমার গলার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আমার স্বামী এবং বড় ছেলেকে ডাকলাম। কিন্তু তাদের কোন সাড়াশব্দ নেই।
পরে আরও হুঁশ ফিরার পর খেয়াল করলাম আমার ১০ দিনের ছেলে ইয়াগিয এখনও আমার বুকে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। এটা আমাকে যেন কিছুটা স্বস্তি দিল। আশেপাশে থেকে অনেকের চাপা কণ্ঠে আর্তনাদ ভেসে আসছিলো। সবারই যেন বেঁচে ফিরার আশা।

ধ্বংসস্তুপের তলদেশে জীবন
আমি শব্দ পেয়ে নিজের সব শক্তি দিয়ে ডাকতে থাকলাম, কে আছেন? আমাকে শুনতে পাছেন? কেউ কি আছেন? কিন্তু আমার ডাক যেন ভেঙে পড়া ইট-কংক্রিটের বাহিরে যাচ্ছিল না। আমার হাতের পাশে থাকা একটি ইটের টুকরা হাতে নিয়ে ওয়্যারড্রবে বাড়ি দিতে শুরু করলাম এই ভেবে যে, কেউ আমার শব্দ শুনতে পাবে। কিন্তু সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে।
আমার ছেলে বেশিভাগ সময় ঘুমিয়ে ছিল। কিছু সময় পর সে কেঁদে ঘুম থেকে ওঠে। তখন কোনোমত আমি আবার তাকে বুকের দুধ খাওয়াই। সেই ধ্বংসস্তুপের নিচে না খাওয়ার কিছু ছিল না পান করার মত পানি ছিল। এই অবস্থায় আমি চাচ্ছিলাম আমার ছেলের জন্য হলেও আমাকে বেঁচে থাকতে হবে।
আমি উদ্ধার কর্মীদের কথা বলার ও পায়ের শব্দ পাচ্ছিলাম কিন্তু তা অনেক দূর থেকে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি শক্তি সঞ্চয় করে রাখব এবং শব্দগুলো কাছাকাছি থেকে আসলে আমি ফিরতি শব্দ করব।
নিচে আটকা পড়ে থাকার সময় আমার সময়ের কোন জ্ঞান ছিল না। শুধু আমার ছেলের জন্য আমি বেঁচে ছিলাম। আমার মাথায় অনেক ধরণের খেয়াল আসছিল আমার আত্মীয়দের কেমন অবস্থা আছে। আমার ৩ বছরের ছেলে সে কেমন আছে।
৯০ ঘণ্টারও বেশি সময় আটকে থাকার পর আমি কুকুরের শব্দ শুনতে পাই। তখন শুনতে পাই কেউ আছেন? জীবিত আছেন কেউ? আমি প্রথমে মনে করেছিলাম ঘুমে স্বপ্ন দেখছি। পরে বুঝলাম এটা বাস্তবতা। উদ্ধার কর্মীরা প্রথমে আমার ছেলেকে বের করল। তারপর আমাকে বের করল।
বের হয়ে আমি দেখছি অনেক মানুষের ভিড় তবে তাতে আমার কোন পরিচিত মানুষ নেই। অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেয়ার সময় জানতে পেলাম আমার স্বামী এবং ছেলে দু’জনকেই উদ্ধার করা হয়েছে এবং তারা ঠিক আছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ৪ দিন আটকা পড়ার পরও নেকলা এবং তার নবজাতকের কোন বড় ক্ষতি হয়নি। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। অন্যদিকে, তার স্বামী এবং বড় ছেলে পায়ে আঘাত পেয়ে অন্য হাসপাতালে ভর্তি।
হাসপাতাল থেকে ফিরে থাকার কোনো জায়গা না থাকায় বর্তমানে তারা এক আত্মীয়ের সাথে থাকছেন।








