এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে সাম্প্রতিক এক উত্তপ্ত ফোনালাপ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে নতুন করে জটিল করে তুলেছে। লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের জেরে দুই নেতার মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
লেবাননে ইসরায়েলের হামলার পর তেহরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান আলোচনা স্থগিত করার হুমকি দিয়েছে। এতে ইরানের সঙ্গে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সোমবার (১ জুন) ওই ফোনালাপ নিয়ে এক সাংবাদিক যখন ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করেন যে তিনি কি নেতানিয়াহুকে পাগল বলে অভিহিত করেছিলেন এবং অকৃতজ্ঞতার অভিযোগ তুলেছিলেন, তখন ট্রাম্প তা অস্বীকার করেননি।
বুধবার (৩ জুন) সম্প্রচারিত পড ফোর্স ওয়ান পডকাস্টে ট্রাম্প বলেন, হ্যাঁ, বলেছিলাম। তবে আমি রাগান্বিত ছিলাম না। লেবাননের সঙ্গে তার অবিরাম সংঘাত নিয়ে আমি কিছুটা বিরক্ত ছিলাম।
তবে একইসঙ্গে তিনি যোগ করেন, আমি নেতানিয়াহু খুব পছন্দ করি এবং তার সঙ্গে খুব ভালোভাবে কাজ করি।
এই উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্প এমন একটি চুক্তি বিবেচনা করছেন, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করতে পারে এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনার পথ খুলে দিতে পারে।
এছাড়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় পুরোপুরি চালু রাখার বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেন। বুধবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সেরা পরিবারগুলোর মধ্যেও যেমন কৌশলগত মতপার্থক্য থাকে, আমাদের মধ্যেও তেমন কিছু বিষয় নিয়ে মতভেদ হয়। কিন্তু আমরা সবসময় সমাধানের পথ খুঁজে পাই।
তিনি আরও বলেন, সকালে আমরা কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, আবার বিকেলের মধ্যেই একমত হয়ে যেতে পারি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ফোনালাপ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক ও রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে হোয়াইট হাউসের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ইঙ্গিত হতে পারে।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক এবং গ্লোবাল সিচুয়েশন রুমের প্রেসিডেন্ট ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের অভ্যাস হলো ওয়াশিংটন কী বলছে, তা উপেক্ষা করে নিজের মতো করে এগিয়ে যাওয়া।
তার মতে, ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে একসঙ্গে সামরিক পদক্ষেপে গিয়ে এখন বুঝতে পারছেন, এমন এক নেতার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর ফল কী হতে পারে, যার রাজনৈতিক লক্ষ্য সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের সঙ্গে মেলে না।
ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার বিষয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর অবস্থান মোটামুটি একই। তবে লেবানন ইস্যুতে দুই দেশের অগ্রাধিকারে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা চলাকালেও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ-এর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, যে কোনো যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি জনসমর্থন কমেছে। এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা যায়, ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। ২০২৩ সালে হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর আগে এই হার ছিল ৪২ শতাংশ।
মার্কিন রক্ষণশীল মহলের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিও প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াতে প্রভাবিত করেছে। যদিও হোয়াইট হাউস ও নেতানিয়াহু এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সাবেক জাতীয় সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ কেন্দ্রের পরিচালক জো কেন্ট মার্চে পদত্যাগ করে দাবি করেন, ইসরায়েল এবং তাদের শক্তিশালী মার্কিন লবির চাপে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি।
তবে ইসরায়েলপন্থী লবিং সংগঠন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপিএসি) তার এই মন্তব্যকে পুরনো ইহুদিবিদ্বেষী প্রচারণা বলে আখ্যা দেয়।
কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও ট্রাম্পকে নেতানিয়াহুর সঙ্গে প্রকাশ্যে মতভেদ দেখাতে উৎসাহিত করতে পারে।
ব্রুয়েনের ভাষায়, এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব প্রদর্শনের রাজনৈতিক প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
তার মতে, লেবানন বা গাজায় নেতানিয়াহুর কিছু পদক্ষেপ এমন, যা ট্রাম্প বা রিপাবলিকানদের জন্যও রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সম্পর্ক অতীতেও নানা সময়ে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে।
তিনি বিল ক্লিনটন-এর সঙ্গে অসলো শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধে জড়িয়েছিলেন। বারাক ওবামা-এর সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও বেশি উত্তপ্ত ছিল, বিশেষ করে ২০১৫ সালে কংগ্রেসে ইরাননীতি নিয়ে দেওয়া বিতর্কিত ভাষণের পর।
এছাড়া জো বাইডেনের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি ঘটে, যখন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহ আটকে রাখার অভিযোগ তোলেন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের গবেষক নাটান স্যাক্স বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক বরাবরই কঠিন ছিল। তিনি শুধু কঠোর নন, বরং অত্যন্ত সন্দেহপ্রবণ আলোচকও।
ট্রাম্প অতীতেও নেতানিয়াহুর প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। গত বছর ইরানে ইসরায়েলি হামলার পর এক অস্থির যুদ্ধবিরতি হুমকির মুখে পড়লে তিনি প্রকাশ্যেই নেতানিয়াহুকে নিয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন।
তবুও সামগ্রিকভাবে দুই নেতার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠই ছিল। নেতানিয়াহু একাধিকবার ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বন্ধু বলে অভিহিত করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে প্রচলিত ধারা ভেঙে নতুন পদ্ধতি গ্রহণে ট্রাম্পের আগ্রহ নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার অন্যতম কারণ।
তবে সাম্প্রতিক এই মতবিরোধ দীর্ঘমেয়াদে দুই নেতার সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
নাতান স্যাকসের ভাষায়, এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এটি একবারের ঘটনা, নাকি বড় কোনো পরিবর্তনের পূর্বাভাস এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। অতীতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বহু ব্যক্তিকে নিয়ে তার অবস্থান বদলেছেন। তাই এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।








