ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্ত হিসেবে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করার পর পাল্টা এ দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১০ আগস্ট) হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইরানের কারণে গত ৫০ বছরে যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তাঁর প্রশাসন অর্থ আদায়ের চেষ্টা করবে। তেহরানের দাবির সরাসরি জবাব হিসেবেই তিনি এ অবস্থান নিয়েছেন।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সম্মত না হওয়া পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালি খুলবে না। ইরান ও ওমানকে বিভক্তকারী এই জলপথ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হতো।
সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইরান ক্ষতিপূরণ চেয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রও গত ৫০ বছরে ইরানের কারণে হওয়া ক্ষতির জন্য অর্থ চাইবে। তিনি জানান, এই অর্থের মধ্যে ওই অঞ্চলে নিহত মার্কিন সেনাদের পাশাপাশি ইরানে নিহত বিক্ষোভকারীদের পরিবারের জন্য অর্থ দেওয়ার বিষয়ও থাকবে।
ইরানে সাম্প্রতিক প্রাণহানি নিয়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত চার মাসে ৫২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে তেহরানের দাবি, জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভে প্রায় ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৭ হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন বিক্ষোভকারী ছিলেন বলে সংগঠনটি দাবি করে।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, ২০০০ সালের অক্টোবরে ইয়েমেনে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস কোল-এ হামলায় নিহত ১৭ মার্কিন নাবিকের পরিবারকেও ইরানের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। তবে ওই হামলার জন্য ইরান নয়, আল-কায়েদাকে দায়ী করা হয়েছিল।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও গাজার মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর জন্যও ইরানকে দায়ী করার কথা বলেন।
এদিকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা নিয়ে ইরান ও ওমানের আলোচনা চলছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনা ‘সুষ্ঠু ও গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে’। দুই দেশের মধ্যে নৌপথের একটি মানচিত্র নিয়েও সমঝোতা হয়েছে। তবে কিছু কারিগরি বিষয় এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
বাঘাই বলেন, নিরাপদ নৌ চলাচল, পরিবেশ সুরক্ষা, সামুদ্রিক সেবা ও অপরাধ দমনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর দাবি, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড নৌপথটিকে অনিরাপদ করে তুলেছে। ইরানের বন্দরগুলোতে ওয়াশিংটনের নৌ অবরোধকে তেহরান ‘আগ্রাসনের কর্মকাণ্ড’ হিসেবে বিবেচনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, জুলাইয়ে অবরোধ পুনর্বহালের পর তারা ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে এবং অন্তত দুটি জাহাজকে ‘অচল’ করেছে। সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, অবরোধের কারণে ইরানের খার্গ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি ‘সম্পূর্ণ বন্ধ’ হয়ে গেছে।
ট্রাম্প সোমবার অবরোধকে ‘ইস্পাতের দেয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করে দাবি করেন, বর্তমানে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর হাতে। তাঁর দাবি, জলপথটি খোলা রয়েছে এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী সেখান থেকে মাইন সরিয়ে দিয়েছে।

তবে সামুদ্রিক পরিবহনবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মেরিনট্রাফিকের তথ্য বলছে, শুক্রবার ১৫টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করলেও শনিবার তা কমে ১১টিতে এবং রোববার ছয়টিতে নেমে আসে। ইরানের নির্ধারিত নৌপথ দিয়ে ১৭টি জাহাজ চলাচল করেছে। আরও ১০টি জাহাজ অনির্ধারিত হিসেবে চিহ্নিত একটি পথ ব্যবহার করেছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিশেষ সহকারী চার্লস কাপচান ট্রাম্পের ক্ষতিপূরণ দাবিকে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরান ও ট্রাম্প প্রশাসন উভয়েরই শক্তিশালী প্রণোদনা রয়েছে। তিনি বলেন, ইরান তেল রপ্তানি করতে না পারলে টিকে থাকতে পারবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পও উচ্চ জ্বালানি মূল্যের মুখোমুখি হতে চান না।







