চীনের বিখ্যাত কবি হান-শান (কোল্ড মাউন্টেইন)-এর সাথে তাঁর আর দুই বন্ধু ফেং-কান (বিগ স্টিক), শিহ-তে (পিকআপ) এর নাম নিবিড়ভাবে জড়িত। অষ্টম/নবম শতকের এই তিন সন্ন্যাসী-কবিকে নিয়ে ঐতিহাসিক তথ্য অপ্রতুল হলেও তাদের নিয়ে লোকগল্প-গাথা এখনও প্রচলিত। পূর্ব চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের তিয়ানতাই পর্বত এই তিন বন্ধুর মিলনস্থল। তিয়ানতাই অর্থ স্বর্গীয় সোপান।
তিন বন্ধু ধর্ম, দর্শন নিয়ে খুব একটা মুখ খুলতেন না। তাও মত অনুসারীরা তাদের নিজের করে ভাবত, আবার জেন বৌদ্ধরাও তাদের নিজের মনে করত। ধর্মমত নিয়ে চুপ থাকলেও নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা-তামাশায় তারা সিদ্ধহস্ত ছিলেন। এমনকি একে অপরকে নিয়ে মশকরা মজা করতেও তারা ছাড়তেন না। তবু পাগলাটে, খেপাটে এই তিন বন্ধুর আধ্যাত্মিক সাধনা ও কবিতা নিয়ে মানুষের মধ্যে কৌতুহল ছিল।
ফেং-কান (৭৫০ থেকে ৮৫০ সাল?) সম্পর্কে কিংবদন্তীর গল্প বলে, তিনি বাঘের পিঠে চেপে মাউন্ট তিয়ানতাই-এর কোচিং মঠে পৌঁছান। মঠের গ্রন্থাগারের পেছনে বাস করতে থাকেন। যদিও তিনি একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হিসেবে ছিলেন, তবে তার মাথা কামানো থাকত না বরং উল্টো লম্বা চুল রাখতেন। বন্ধু হান-শান এর মতো ফেং-কানও অদ্ভুত বা পাগলাটে ছিলেন। দর্শন বা বৌদ্ধমত নিয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বিড়বিড় করতেন, -যাই হোক।
১.
আসলে সেখানে কোনো কিছুই নেই
মুছে দেয়া ধুলোর চেয়েও কম।
যে পারে একে আয়ত্ত্বে নিতে
স্থির বসে থাকার প্রয়োজন তার নেই।
২.
সাগরে পাথর ডুবে যাবার মতো
তিনটি জগতে প্রবাহিত
হতচ্ছাড়া আকাশচারী জীব।
দৃশ্যে সব নিমজ্জিত।
যতক্ষণ না বিদ্যুৎঝলকে দেখা যাচ্ছে
জীবন ও মৃত্যু- মহাকাশের ধুলো।
আরেক বন্ধুর নাম শিহ-তে বা হঠাৎ সাক্ষাৎ বা তুলে নেয়া। শিহ-তে তার নামটি পেয়েছিলেন কেন না ফেং-কান তাকে পরিত্যক্ত বালক হিসেবে পেয়েছিলেন। ক্রন্দনরত এক বালককে পেয়ে কোচিং মঠে তাকে তুলে এনেছিলেন ফেং। শিহ-তে তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় সেই মঠের রান্নাঘরেই কাটান। হান-শান এবং শিহ-তে-কে প্রায়ই রান্নাঘরে কৌতুক নিয়ে মেতে থাকতে দেখা যেত।
১.
দেখো চাঁদের আভায় আলোকিত
পৃথিবীর পুরো চারভাগ
নিখুঁত আলো নিখুঁত শূন্যতায়
এক দীপ্তি, যা পরিশুদ্ধ করে।
লোকে বলে, চাঁদ বাড়ে আর ক্ষীণ হয়ে যায়
কিন্তু আমি দেখি না তাকে বিবর্ণ হতে
কেবল জাদুর পাথরের মতো
এ জ্বলে যায় রাত্রি ও দিনে।
২.
কেউ দেখে না
তিন জগতের মধ্যে অশান্তির কারণ
অন্তহীন বিভ্রান্তি।
একবার চিন্তা থামলে মন স্বচ্ছ হয়
কিছুই আর যায় বা আসে না, এমনকি জন্ম অথবা মৃত্যু।
৩.
আমি বাস করি সীমাহীন এক স্থানে
ঘিরে থাকে অনায়াস সত্য সেখানে
কখনো কখনো পৌঁছাই নির্বাণের শিখরে
অথবা খেলি চন্দনকাঠের মন্দিরে।
তবে অধিকাংশ সময়ই আমি কাটাই আয়াসে
এবং খ্যাতি বা সমৃদ্ধির কথা না বলে।
এমনকি সমুদ্র যদি পরিণত হয় এক মালবেরি বাগানে
বেশি কিছু যায় আসে না তাতে।
তাওবাদী ও জেন’রা উভয়েই হান-শানকে (৭৩০-৮৫০ সাল?) নিজেদের বলে দাবি করে। হান-শানের কবিতাতেও এই দুই ঐতিহ্য বা ধারাই লক্ষ্য করা যায়। যদিও তাওবাদী ও বৌদ্ধদের তিনি একইভাবে মক করতেন বা মজা নিতেন বলে গল্প রয়েছে। কিছু ঐতিহাসিক তাকে অষ্টম শতকের বলে মনে করেন।
কিছু মত রয়েছে যে হান-শান সুবিধাপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী শ্রেণির পরিবারেই বড় হয়েছেন। তবে ৩০ বছর বয়সে পরিবার ও সম্পদ ত্যাগ করে সন্ন্যাসী কবির জীবন বেছে নেন তিনি। চলে যান পর্বতে এবং পাথুরে দুর্গম গুহায় বাস শুরু করেন। এখান থেকেই তিনি তার নামটি বেছে নেন, হান-শান অর্থাৎ শীতল পর্বত।
তিয়ানতাই পর্বতে এই তিনজনের বন্ধুত্ব জমে উঠেছিল। তৈরি হয়েছিল তাদের নিয়ে অনেক গল্পগাথা। যেমন, তাঁরা সন্ন্যাসীদের আত্ম-গুরুত্ব নিয়ে মজা করতেন। নিজেদের আপাত বোকামি বা পাগলামি দিয়েই আগ্রহীদের প্রকৃত ধর্ম বা পথের সন্ধান দিতেন। ঐতিহ্য বলে, হান-শান ১২০ বছর বেঁচে ছিলেন। তার কবিতাতেও দীর্ঘ জীবন পাড়ি দেয়ার সংকেত আছে। কিংবদন্তী বলে, হান-শান মরেননি বরং অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন।
নিজের সম্পর্কে পাগলামিতে ভরা যে ইমেজ তিনি তৈরি করেছিলেন তা সত্ত্বেও এক মহান আধ্যাত্মিক সত্তার প্রকাশ ঘটেছিল। হান-শানের অন্তর্ধানের পর, পাথর ও গাছের ওপর খোদাই করা এই তিন বন্ধুর কবিতাগুলো একসাথে সংগ্রহ করা হয় এবং সেগুলো প্রচার পেতে শুরু করে। তাঁদের কবিতাতেই তাঁদের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও বিষয়ের নির্দশন পাওয়া যায়।
১.
শীতল পর্বতের ওপর ঠিকরাচ্ছে একাকি চাঁদ
শূন্য আকাশে কিছু নেই আর আলোকিত করার
মূল্যবান স্বর্গীয় অমূল্য রত্ন
স্কন্ধে নিমজ্জিত দেহে সমাহিত
২.
শীতল পর্বতের পথ ধরে ওপরে ওঠা
এই ঠাণ্ডা পর্বতের পথের যেন শেষ নেই
নুড়ি ও পাথরে এ দীর্ঘ গিরিসঙ্কট শ্বাসরুদ্ধ
এই চওড়া খাঁড়ি, কুয়াশাভেজা ঘাস
পিচ্ছিল শ্যাওলা, যদিও বৃষ্টি নেই
গাইছে পাইন, যদিও বাতাস নেই
পৃথিবীর বন্ধন লাফিয়ে পেরিয়ে
কে পারে আসতে আর
বসতে আমার সাথে সাদা মেঘের ভেতরে?
৩.
স্রোতের গভীরে শান্ত প্রবাহ দেখতে
অথবা চূড়ায় ফিরে পাথরের ওপর বসে থাকতে
আমার মন তো রয়ে যায় মেঘের মতো অনাসক্ত
দূরের পৃথিবীতে আমার আর কি দরকার।
সূত্র:
1. Riprap and Cold Mountain Poems, by Gary Snyder
2. The Collected Songs of Cold Mountain, by Red Pine
#Feng-kan (Big Stick) #Shih-te (Pickup) #Han-shan (Cold Mountain)







