স্যাটায়ার

ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর: স্বর্গরাজ্য থেকে স্মৃতিসৌধ

সাদা পাথর নিয়ে একটি রম্য রচনা

রাজনৈতিক caricature depicting a man with a stern expression holding a pen. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

প্রতীকী ছবি

অডিও সংবাদএই খবরটি পডকাস্টে শুনুন

ভুল সবই ভুল। কিন্তু ভুলের সাথে ভোলাগঞ্জের কী সম্পর্ক? কিংবা ভোলাগঞ্জের সঙ্গে ভুলের! আছে নিশ্চয় সম্পর্ক একটা। ভুল থেকে ভোলা, কিংবা ভোলা থেকে ভুল। যা থেকে যা-ই হোক, আসলে সবই যখন ভুল; তখন পাথরেও ভুল হতে সমস্যা কোথায়? ভোলাগঞ্জের পাথর বলে কথা।

সেই ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরের অবস্থা এখন এমন যে, বিয়েবাড়ি গিয়ে দেখলেন পোলাও আছে, কিন্তু মুরগি উধাও।

আগে ছিল যতদূর চোখ যায় সাদা সাদা পাথর, মাঝখানে নীল দরিয়া(!), চারপাশে পাহাড়ে মেঘের আলিঙ্গন। এখন গেলে চোখে পড়ে খানা-খন্দ, যেন রেমিট্যান্সের সন্ধানে পাথরগুলো চাকরি নিয়ে বিদেশ চলে গেছে।

প্রশাসন নাকি অভিযান চালায়। এ যেন এরকম: আজ অভিযান হবে, তাই দয়া করে কাল থেকে চুরি করুন। পাথর চোরেরা বুঝে গেছে, আগে যত অ্যাকটিভিজমই করুন, উজির-নাজির হলে সবকিছু ফটোসেশন। ফটোসেশন শেষে ‘চোরেরে কয় চুরি করো, গৃহস্থরে কয় ধরো ধরো’।

পাথরের এই গায়েব হওয়া এমন রহস্য যা শার্লক হোমসও মেলাতে পারবেন না। তবে একটা জল্পনা আছে। পাথরগুলো নাকি ‘প্রাইভেট ট্যুরে’ চলে গেছে দেশের বাইরে। কারণ  জনারণ্যে এখানে থাকার আর কোনো নিরাপত্তা নেই।

সেই তিনি প্রথমে হেলিকপ্টার আর পরে নাদুস-নুদুস পরিবহন বিমানে দেশ ছাড়ার পর থেকে এরকমই ত শুনে আসছি। সব জায়গায়। সবার কাছে।

এলাকার এক বৃদ্ধ বলছিলেন, আগে যারা কিডনিতে পাথরের কথা শুনে ভয় পেতেন, এখন তারা স্বপ্ন দেখেন: ভোলাগঞ্জে গেলে ফ্রি ট্রিটমেন্ট। কিডনি থেকে পাথরেরা সাঁই-সাঁই করে পরবাসী হয়ে যাবে। শুধু কিডনি কেন, গলব্লাডার বা আর যেখানে যেখানেই স্টোন থাকুক, ভোলাগঞ্জ গেলে পাথরেরা সব ভুলভুলাইয়া। ‘ন্যাচারাল মেডিকেল ট্যুরিজম’।

পানিও এখন এত হালকা হয়ে গেছে যে, মাছ ভাবছে: এটা কি নদী, নাকি মিনারেল ওয়াটার প্লান্ট?

পর্যটকরা আগে ছবি তুলত ‘সাদা পাথরের স্বর্গরাজ্যে’, এখন তুলছে ‘সাদা পাথরের স্মৃতিসৌধে’। শিগগিরই হয়তো এখানে নতুন সাইনবোর্ড লাগবে: ভোলাগঞ্জ: এখানে একসময় পাথরেরাও ছিল।

কোনোদিন হয়ত এখানে মিলতে পারে ‘সোনার পাথরবাটি’ও। পাথর থাকলে সবই সম্ভব। সবই ফকিরের কেরামতি।

এখনকার ভোলাগঞ্জে গেলে মনে হবে, কারও বাড়ির শো-কেসে একসময় দামি সব শো-পিস সাজানো ছিল। একদিন সব বিক্রি করে শুধু ধুলো রেখে দিয়েছে। আর সেই ধুলো থেকে হয়তো ধূলিঝড়ও হবে একদিন।

পাথরেরা বলছে, ‘একদিন আমরাও’। ‘রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী!’

ছবি-সংগৃহিত

‘টাস্কফোর্স’ নাকি গঠন করা হয়েছে, কিংবা গঠন করা হবে। এই টাস্কফোর্সের মূল কাজ: বসে বসে বোঝা– স্বপ্নের মতো কেন পাথরেরা হারিয়ে গেল! তাদের জাতীয় সঙ্গীত: আমার স্বপ্ন গুলো কেন এমন স্বপ্ন হয়! কিংবা: কেন ভালবাসা হারিয়ে যায়. দুঃখ হারায় না; কেন স্বপ্ন ভেঙে যায়. মানুষ কথা দিয়ে কথা রাখে না!

তারা অবশ্য ‘দাগ থেকে দারুণ কিছু’র মানুষ। একদিন হয়তো শুনব, তারা ‘পাথর পুনর্বাসন প্রকল্প’ চালু করেছে। বিদেশে পালিয়ে যাওয়া পাথর ফিরিয়ে আনতে এই প্রকল্প।

যে দেশের আমলারা পুকুরে মাছ চাষ দেখতে বিদেশে যান, কিংবা স্কুল মিলের অভিজ্ঞতা নিতে; তাদের জন্য পাথর ফিরিয়ে আনতে বিদেশ সফর ত অতি মামূলি বিষয়।

ধলাই নদীর অবস্থা এখন অনেকটা গৃহস্থের ড্রইংরুমের মতো। আগে ছিল সোফা, টেবিল, শো-পিস; এখন শুধু ফাঁকা। নদীও মনে হয় দুঃখে পানি ঢেলে যাচ্ছে, যদিও সেই পানিতে পাথরের ছোঁয়া নেই।

পর্যটন ব্যবসায়ীরা অবশ্য এখনই হতোদ্যম হচ্ছেন না। সাদা পাথর না থাকায় এখন পর্যটক আকর্ষণের জন্য নতুন প্ল্যান তাদের: ‘খালি জায়গা ভ্রমণ’, ‘গর্ত দর্শন’, অথবা ‘চুরি হওয়া পাথরের কল্পনার জগৎ’।

স্থানীয় চায়ের দোকানে গেলে এখন গল্প হয়, আগে এই পাথরের কারণে রাস্তা ছিল খারাপ। আর এখন পাথর না থাকায় মেট্রো না হোক, অন্তত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে।

কিছু লোকের ধারণা, সাদা পাথর আসলে ডিম পাড়ত, আর সেই ডিম থেকে ছোট ছোট পাথর বের হত; এখন সব ডিমই চুরি হয়ে গেছে।

প্রকৃতিপ্রেমীরা কাঁদছেন, কিন্তু চোরেরা হাসছেন। তারা নাকি নিজেদের ফেসবুক গ্রুপে ছবি দেন: ‘আজকের কালেকশন’, সঙ্গে হ্যাশট্যাগ #StoneHunter #NatureLoot।

বড় চোরেরা বিদেশে পালিয়ে গেলে ছোটদের দা-খুন্তি চুরির দৃশ্য আমরা ত লাইভে দেখেছি। টেলিভিশনে কিংবা ফেসবুক-ইউটিউবে।

সেই সামাজিক মাধ্যমে পাহাড়ে এখনো মেঘ নামে, নদীতে পানি নামে, কিন্তু পাথর নামে না। মেঘেরা হয়তো ভাবছে, এখানে আসার আর মানে কী, যখন সাদা পাথরের সঙ্গে সেলফি তোলার সুযোগই নেই।

সব মিলিয়ে ভোলাগঞ্জ এখন গল্পের জায়গা। যেখানে একসময় ছিল পাথরের সমুদ্র, এখন আছে শুধু পাথরের গল্প। আগামী প্রজন্ম হয়তো জাদুঘরে গিয়ে দেখবে: একটা ছোট সাদা পাথর, তার নিচে লেখা থাকবে: এটাই ভোলাগঞ্জের শেষ স্মৃতি।

কেউ বলছেন, কক্সবাজারের বালি দেখতে হলে এখনই যান। নইলে শিগগিরই বালিও হয়তো উধাও হয়ে যাবে পাথরের মতো। তখন হয়তো নতুন স্লোগান হবে: পাথর, বালু কিংবা বালি– জানা পথ গণডাকাতি।

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…