জমিদারী আমলের ঐতিহাসিক এবং অপূর্ব স্থাপনা সিলেটের পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ি। প্রায় দুইশ’ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কুলাউড়ার পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি।
মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার পূর্বে এই জমিদার বাড়ির অবস্থান। জমিদার বাড়ির কারুকার্যময় আসবাবপত্র, মসজিদের নকশা, ইমামবাড়া, বিশাল দীঘি যে কাউকে আকৃষ্ট করতে যথেষ্ট। রয়েছে বৃটিশ ও জমিদারী আমলের দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যকীর্তি।
প্রায় দুইশ’ বছরের ঐতিহ্যকে ঘিরে রয়েছে প্রাচীনতম কালের সাক্ষী ঐতিহাসিক নবাব বাড়ি মসজিদ। বহুবছর থেকে শিয়া-সুন্নীর উভয় অনুসারীরা সম্মিলিতভাবে এখানে নামাজ আদায় করেন। যার কারণে পৃথিমপাশা জমিদার বাড়ির এই মসজিদটি সম্প্রীতির এক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে।
ধর্মীয় প্রচার কাজের অংশ হিসেবে নবাব বাড়ির সম্মুখে শান বাধানো বিশাল দিঘীর পশ্চিম পাড়ে মুঘল ও পারস্যের স্থাপত্যের আদলে নির্মিত করা হয় মসজিদটি। তিন গম্বুজ বেষ্টিত এই মসজিদটিতে রয়েছে নানা কারুকার্য ও নান্দনিক স্থাপত্যে শিল্পের নিদর্শন। অনেক কিংবদন্তী ও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক নবাব বাড়িতে মুঘল আমল থেকে অনেক বরেণ্য ব্যাক্তিরা এসেছেন।
এরমধ্যে ১৯৫১ সালে ইরানের রাজা রেজা শাহ পেহলভী অন্যতম। তাঁর সাথে সেই সফরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের সেনা প্রধান জেনারেল আইয়ুব খান, পূর্ব-পাকিস্তানের গর্ভণর খাজা নাজিম উদ্দিন, প্রথম আমেরিকার রাষ্ট্রদূত হিলব্রেক প্রমুখ ছিলেন। ত্রিপুরার মহারাজা রাধা কিশোর মানিক্য বাহাদুরসহ ঢাকা, লাখনো ও মুর্শিদাবাদের বহু নবাব এখানে এসেছেন।উপমহাদেশের অনেক উর্দু ও ফার্সী কবি, বিখ্যাত সাহিত্যিকদেরও এখানে পদাপর্ণ ঘটেছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুঘল সম্রাট আকবরের সময়কালে ১৪৯৯ সালে পারস্য (ইরান) থেকে ধর্ম প্রচারের জন্য ভারতবর্ষে আসেন সাকি সালামত খাঁন। পারস্য রাজ বংশের প্রতিনিধি সাকি সালামত খাঁনকে দিল্লী সম্রাট সম্মানিত করেন। পারস্যের সাথে মূঘলদের পূর্বসখ্যতার কারনে সুফি, পন্ডিত ও দার্শনিক সাকি সালামত খাঁন পূর্ব্বাংলায় বিপুল পরিমাণ ভূূ-সম্পত্তির জায়গীর প্রাপ্ত হোন। তিনি বিশাল জমিদারিও ক্রয় করেন। দিল্লীর সম্রাট তাঁকে নবাবী সনদ প্রদান করলে তিনি দক্ষিন শ্রীহট্টের পৃথিম পাশায় বসতি স্থাপন করেন। যা পারস্যের সকি সালামত খাঁনের নবাবী বংশ। তারপরের ইতিহাস দীর্ঘ!

১৮৭২ সালে আলী আমজাদ খানের নামে একটি ক্লক টাওয়ার স্থাপন করা হয় সিলেটে, যা, ‘আলী আমজাদের ঘড়ি’ নামে বিখ্যাত। বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে সবচেয়ে স্বনামধন্য, শিক্ষানুরাগী, দানশীল নবাব ছিলেন নবাব আলী আহমদ খানের ছেলে নবাব আলী আমজদ খান। তিনি সমাজসেবাসহ জমিদার হিসেবে সারা বাংলা এবং আসামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। মহারানী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষে আগমন উপলক্ষে নবাব আলী আহমদ খানকে বৃটিশ সরকার সিলেটের শিক্ষানুরাগী ও জমিদার হিসাবে সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রন করেন।
নবাব আলী আমজাদ খান মৌলভীবাজার ও কুলাউড়ায় বিভিন্ন স্কুল-কলেজ এবং সুপেয় পানির জন্য দীঘি খনন করেন। তৎকালীণ সময়ে নারী শিক্ষার প্রসারে মৌলভীবাজারে ১৯০৫ সালে মৌলভীবাজার আলী আমজদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন নবাব আলী আমজদ খান। এছাড়া, কুলাউড়ায় প্রতিষ্ঠা করা হয় আলী আমজদ স্কুল এন্ড কলেজ, রবিরবাজার দারুছুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসাসহ অসংখ্য স্কুল-কলেজসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা হয় নবাব পরিবার থেকে।
বর্তমানে বংশধর নবাব আলী ছফদর খান রাজা সাহেবের পুত্র নবাব আলী আব্বাছ খান। তিনি তার বাবার আদর্শে দীক্ষিত হয়ে বাংলাদেশে বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হন। তিনি তিনবারের জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, আমরা এখনো ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির সাথে বসবাস করছি। এই ঐতিহ্যবাহী বাড়ির অন্দরমহল শুধু সংরক্ষিত, এছাড়া পুরো নবাব বাড়ি পর্যটকদের খোলা থাকে।
২৫ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত নবাব বাড়ি অপূরণীয় ক্ষতির পরও পুরানো স্থাপত্য শিল্প আর অতীত ঐতিহ্যকে আঁকড়ে রেখেছেন নবাব পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম। বাড়ির অন্দরমহলে এখনো কারুকার্যময় আসবাবপত্র সংগৃহীত আছে। সামনে রয়েছে সুবিশাল দীঘি। শান বাঁধানো ঘাটে বসলে অতীতের নবাবী সময়ের ভাবনা মনকে আচ্ছন্ন করে।








