ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনীভূত হয়েছে। মধ্য জুনে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে পড়েছে। একের পর এক পাল্টাপাল্টি হামলা শুধু দুই দেশের সম্পর্ককেই উত্তপ্ত করেনি, বরং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল ইরানশাহর, বান্দার আব্বাস, কোনারাক, চাবাহার, বুশেহর এবং আক কালা। হামলায় ইরানশাহর বিমানবন্দরে একজন দমকলকর্মী নিহত হন। এছাড়া চাবাহারে একটি সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার, একটি গুদাম এবং আক কালার একটি রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পাল্টাপাল্টি হামলা
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর সাম্প্রতিক হামলার জন্য ইরানই দায়ী।
মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উত্তেজনা আরও ছড়িয়ে পড়ে। বাহরাইনে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বাজে এবং কুয়েত জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রকেট ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে। পরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করে, তারা কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত কয়েকটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে অঞ্চলের অন্য মার্কিন ঘাঁটিগুলোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে সতর্ক করে সংস্থাটি।
এই পরিস্থিতির আগে মঙ্গলবারও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছিল। মার্কিন বাহিনীর দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাবে ৮০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান চালানো হয়। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই হামলায় দেশটির বিমান ও নৌবাহিনীর আট সদস্য নিহত হয়েছেন।
সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে যুদ্ধবিরতি চুক্তি
বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মধ্য জুনে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি। ওই সমঝোতার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছিল। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়। এখন সেই সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগে একে অপরকে দায়ী করছে ওয়াশিংটন ও তেহরান।
ইরানের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের সার্বভৌম অধিকারের অংশ। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং সেখানে কোনো ধরনের বাধা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালি আমেরিকার হুমকিতে নয়, ইরানের ব্যবস্থাপনাতেই পরিচালিত হবে।’ অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যেকোনো হামলার জবাব আরও কঠোরভাবে দেওয়া হবে। যদিও তিনি একই সঙ্গে দাবি করেছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেবে বলে তিনি মনে করেন না এবং আলোচনার পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
তবে, সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা যুদ্ধবিরতির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। যদি দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য আবারও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের দিকে এগোতে পারে। এর প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।






