‘আমার আহলে বায়তের উদাহরণ নুহ আলাইহিস সালামের কিশতির ন্যায়। যে তাতে আরোহন করল, সে মুক্তি পেল। যে আরোহন করল না, সে ধ্বংস হলো।’ -মুসতাদরাক আল হাকিম, হাদিস নং ৩৩৬৫
পবিত্র কুরআন ও অসংখ্য হাদিসে পাকের বর্ণনার ভিত্তিতে ইমামগণ এ ব্যাপারে একমত যে, আহলে বায়তের ভালোবাসা ফরজ। পবিত্র কুরআনে আহলে বায়তের ভালোবাসা সম্পর্কে নবীজির জবানিতে এসেছে,‘আমি আমার (রিসালাতের) দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে তোমাদের কাছে আমার আহলে বায়তের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া কিছুই প্রত্যাশা করি না।’ (সুরা শুরা,আয়াত নং ২৩) এ আয়াত যখন নাজিল হলো, তখন সাহাবায়ে কেরাম নবীজিকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রসুলাল্লাহ, আপনার আহলে বায়ত কারা, যাদের ভালোবাসা কুরআনের মাধ্যমে আমাদের উপর ফরজ করা হয়েছে? নবীজি উত্তর দিলেন, আলি, ফাতেমা এবং তাঁদের দুই পুত্র (হাসান ও হোসাইন রা.)। (দুররে মনসুর, খণ্ড ৬)
আহলে বায়তের অর্থ কী? কারা আহলে বায়ত? সহজ অর্থে আহলে বায়ত অর্থ ঘরের বাসিন্দা বা সদস্য। এই শব্দযুগল দ্বারা মূলত নবী-পরিবারকে বোঝানো হয়ে থাকে। উপরে কুরআনের আয়াতের তাফসির দ্বারা উল্লিখিত চারজনকে আহলে বায়ত হিসেবে খাস করা হলেও আহলে বায়ত কারা—এ নিয়ে ইমামগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। নানান মতামতের ভিত্তিতে উল্লিখিত চারজন ছাড়াও আহলে বায়ত হিসেবে যাদের বর্ণনা পাওয়া যায়, তারা হলেন নবীজির স্ত্রী-বর্গ, নবীবংশের অপরাপর আওলাদে পাক, বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব।
পবিত্র আহলে বায়তের ভালোবাসার উপর অসংখ্য বর্ণনা এসেছে। নিচে ধারাবাহিকভাবে কিছু হাদিস কোড করার প্রয়াস পাচ্ছি।
১. ঐতিহাসিক আরাফা দিবসে নবীজি তাঁর কাসওয়া উটে উপবিষ্ট অবস্থায় ইরশাদ করেছেন, ‘আমি তোমাদের নিকট দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রেখে যাচ্ছি। একটি হলো পবিত্র কুরআন, অপরটি আমার আহলে বায়ত। তোমরা যদি এ দুটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, তবে কখনো সঠিক পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না।’ (তিরমিজি শরিফ, হাদিস: ৩৭৮৬) এ হাদিসের ভাষার মাধ্যমে একটা বিষয় প্রমাণিত যে, কুরআন এবং আহলে বায়ত এ দুটি একে অপরের পরিপূরক। থিউরিক্যাল কুরআনকে বুঝতে হলে পবিত্র আহলে বায়তের অনুসরণ অপরিহার্য। আর আহলে বায়তের অনুসরণ পবিত্র কুরআন দ্বারা স্বীকৃত। অতএব, যাঁদের অনুসরণ কুরআন দ্বারা স্বীকৃত, তাঁদের প্রতি ভালোবাসার কোনো বিকল্প নাই।
২. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন সন্তানদের তিনটি বিষয়ে শিক্ষা দিতে বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। তারমধ্য প্রথমটি প্রিয় নবীজির ভালোবাসা, দ্বিতীয়টি আহলে বায়তের প্রতি ভালোবাসা, তৃতীয়টি পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত। (জামেউস সগির)
৩. নবীজি একদিন এক সাহাবিকে লক্ষ্য করে বলছিলেন, ‘আল্লাহকে ভালোবাসো, কেননা তিনি তোমাকে তাঁর নিয়ামত দ্বারা রিজিক প্রদান করেন। আর আল্লাহ পাকের ভালোবাসার জন্য আমাকে ভালোবাসো৷ অতঃপর আমার ভালোবাসার জন্য আমার আহলে বায়তকে ভালোবাসো।’ (তিরমিজি শরিফ)
৪. একদিন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হোসাইন রা. এর হাত ধরে ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে, এই দুইজনকে, তাঁদের পিতাকে(হজরত আলি রা.) এবং তাঁদের মাতাকে(হজরত ফাতেমা রা.) ভালোবাসবে, সে কিয়ামতের দিন আমার সাথে একই অবস্থায় অবস্থান করবে।’ (তিরমিজি শরিফ)।
উল্লিখিত এসব হাদিস ছাড়াও আহলে বায়তের ভালোবাসা, মর্যাদা ও ফজিলতের উপর আরো অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে। শুধু যে আহলে বায়তের ভালোবাসার কারণে প্রতিদান আছে তা নয়, বরং আহলে বায়তের উপর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ব্যাপারেও আছে কঠিন হুশিয়ারি। যেমন মুসতাদরাক আল হাকিমে এসেছে, নবীজি বলেছেন, ‘ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ। আমার আহলে বায়তের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীকে আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।’
নবীজির আহলে বায়তকে ভালোবাসা, তাঁদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা এবং তাদের অনুসরণ করার আবশ্যকতা ঐতিহাসিকভাবেও প্রমাণিত। কেননা নবীজির পরে ইসলামের সঠিক শিক্ষা ও প্রচার-প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন পবিত্র আহলে বায়তের সদস্যরা।
শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কেরামরাও আহলে বায়তকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতেন বলে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন সহিহ বোখারিতে এসেছে, একদিন হজরত আবু বকর রা. এর সামনে আহলে বায়তের আলোচনা হচ্ছিল। তখন তিনি বললেন, ‘ঐ সত্তার শপথ, যার কুদরতি হাতে আমার প্রাণ। আমার কাছে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটাত্মীয়দের সাথে সদাচরণ করা আমার নিজের পরিবারের সাথে সদাচরণ ও সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেয়ে প্রিয়।’ একইভাবে হজরত উমর ফারুক (রা.) ইমাম হোসাইন (রা.)—এর সম্মানে নিজের আসন ছেড়ে দিয়ে তাঁকে বসতে দিতেন মর্মে বর্ণনা পাওয়া যায় আর রিয়াদুন রাদরাহ গ্রন্থে।
মোটকথা, পবিত্র আহলে বায়তের ভালোবাসা সমস্ত উম্মতের উপরে অবধারিত। অন্তরে তাঁদের ভালোবাসার কোনো বিকল্প নাই। নবীজির হাদিসে পাকের ভাষ্যে তাঁদের ভালোবাসা মূলত নবীজির এবং আল্লাহর ভালোবাসা। পক্ষান্তরে তাঁদের প্রতি শত্রুতা পোষণকারী এবং নিন্দাকারীদের নিশ্চিতভাবে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে।







