যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ৪ দিন। দেশটির ভোটাররা আগামী ৫ নভেম্বর তাদের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে ভোট দিবেন। এবারের নির্বাচনে দেশটির বড় একটি অংশ তরুণ ভোটার। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস এবং রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প তরুণ ভোটারদের হাতে রাখতে নানান কৌশল অবলম্বন করছেন। কারণ এই তরুণ ভোটাররাই এবারের নির্বাচনে বিশাল পার্থক্য গড়ে তুলবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা বর্তমানে রাজনৈতিক ক্ষেত্রকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করছে এবং ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষত সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং তাদের প্রিয় ইস্যুসমূহ নিয়ে আলোচনার মাত্রা বেড়েছে।
তরুণ ভোটারদের বিশেষভাবে লক্ষ্য করে নির্বাচনী প্রচারণার কৌশলগুলোতেও পরিবর্তন এসেছে। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারদের এই গোষ্ঠী প্রচলিত ও প্রগতিশীল উভয় নীতির প্রতি আগ্রহী এবং তাদের প্রধান ইস্যুগুলো নির্বাচনের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। সামাজিক মাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে এই প্রজন্ম রাজনৈতিক চিন্তাধারায় প্রভাবিত হতে এবং সংগঠিতভাবে কাজ করতে সক্ষম হয়েছে।
সম্প্রতি হার্ভার্ড ইনস্টিটিউট অফ পলিটিক্স (আইওপি) ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী ভোটারদের নিয়ে একটি জরিপ করছে। ফলাফলে দেখা গেছে, তরুণ ভোটারদের কাছে কমলা হ্যারিস (৪৯ শতাংশ) সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (৩২ শতাংশ) চেয়ে ১৭ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে। তরুণদের মধ্যে ছেলে ভোটাদের কাছে কমলা হ্যারিস ডোনাল্ড ট্রাম্পের থেকে ১৪ শতাংশ এবং নারী ভোটারদের কাছে ২৫ শতাংশ এগিয়ে রয়েছেন।
দেশটির তরুণ সমাজ বলছে, তাদের সহপাঠীদের একটি বড় অংশ এই নির্বাচনে ইতিমধ্যে আগাম ভোট দিয়েছে বা ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ভ্যান্ডারবিল্ট কলেজ ডেমোক্র্যাটসের সভাপতি অ্যান্ড্রু কিয়ং বলেছেন, এটি আলোচিত নির্বাচন হতে যাচ্ছে। আমার বয়সী লোকেদের কাছে এটি খুব চিত্তাকর্ষক। ফেয়ার ইলেকশন সেন্টারের ক্যাম্পাস ভোট প্রজেক্ট অনুসারে, ঐতিহাসিকভাবে তরুণ প্রাপ্তবয়স্করা তাদের বয়স্কদের তুলনায় কম ভোট দেন। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, এবারের নির্বাচনী চক্রে তেমনটি হবে না।

বেলমন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং বেলমন্ট কলেজ রিপাবলিকানদের সভাপতি মায়া কনরাড বলেন, তরুণদের ভোট চালু হতে চলেছে এবং এটি শক্তিশালী হতে চলেছে। তিনি বলেন, আমি আমার সমবয়সীদের কাছ থেকে রাজ্যে এবং রাজ্যের বাইরে ভোট দিতে দেখেছি। আমার পরিচিত সবাই ভোট দিচ্ছে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে তরুণরা ভোট দিচ্ছে কারণ এটি আমাদের ভবিষ্যত নির্ধারণ করবে।
তরুণ ভোটারদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা ও এর প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রে তরুণ ভোটারদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তারা নতুন একটি ভোটার শ্রেণি হিসেবে গড়ে উঠছেন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে তরুণদের ভোটদানের হার প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা আগের তুলনায় বেশি এবং এটি প্রমাণ করে যে তারা এখন আরও বেশি সচেতন এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছেন। এই প্রজন্ম প্রযুক্তিগত সুবিধায় অভ্যস্ত, যা তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং সংগঠনের পদ্ধতিকে বদলে দিয়েছে। তারা সামাজিক মাধ্যম, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং টুইটারের মতো প্ল্যাটফর্মে তাদের মতামত শেয়ার করতে, নতুন ইস্যু সম্পর্কে জানতে এবং মতামত গঠনে সংগঠিত হতে পারেন। রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে তাঁরা নির্বাচনের ফলাফলে এবং রাজনৈতিক প্রার্থীদের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছেন।
গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ও তরুণদের রাজনৈতিক অবস্থান
তরুণ ভোটারদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক ন্যায়বিচার, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা সংস্কার সম্পর্কিত বিষয়গুলোর প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখা যায়। ২০২০ সালের নির্বাচনে দেখা গেছে, তরুণ ভোটাররা মূলত তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন, এবং তাই তাদের ভোট প্রায়শই সেই প্রার্থীদের দিকে যায় যারা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন এবং স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
জরিপে তরুণ আমেরিকানদের মধ্যে নির্বাচনী রাজনীতির প্রতি বৃহত্তর হতাশার কথা উঠে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বন্দুক নিয়ন্ত্রণ এবং গাজার যুদ্ধের মতো বিষয়গুলোতে বাইডেন প্রশাসনের পদক্ষেপের তাদের মধ্য অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাছাড়া উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়া, আবাসন সংকটসহ বেশ কিছু বিষয় প্রাধান্য পাবে তরুণদের কাছে।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ
জলবায়ু পরিবর্তন তরুণদের জন্য একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। গ্লোবাল ওয়ার্মিং, বায়ু দূষণ, এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয়ের কারণে তরুণরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তারা মনে করেন যে, ভবিষ্যতে তাদের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন হতে পারে যদি সঠিক সময়ে পদক্ষেপ না নেওয়া হয়। অনেক তরুণ জলবায়ু অ্যাক্টিভিজমে জড়িত রয়েছেন এবং তারা সেই প্রার্থীদের সমর্থন করেন যারা জলবায়ু পরিবর্তনকে রোধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন। ২০২০ সালের নির্বাচনে বাইডেনের জলবায়ু নীতি এবং গ্রিন নিউ ডিলের মতো পরিকল্পনা তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিল। একই সাথে তারা এই বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দেন কারণ এটি বিশ্বজুড়ে সংকট তৈরি করছে এবং এতে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
শিক্ষা সংস্কার এবং ছাত্রঋণ
তরুণ ভোটারদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো শিক্ষা সংস্কার। বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছাত্রঋণের সংকট একটি বড় সমস্যা, যা তরুণদের মধ্যে দারিদ্র্য এবং আর্থিক সংকটের সৃষ্টি করে। ছাত্রঋণের পরিমাণ তরুণদের জীবনে আর্থিক চাপ বাড়িয়ে তোলে, ফলে তাদের অনেকেই এই বোঝা থেকে মুক্তি চান এবং এই ব্যাপারে সরকার থেকে সমর্থন চান। শিক্ষা খাতের উন্নয়নে তরুণরা এমন প্রার্থীদের সমর্থন করে যারা ছাত্রঋণ মওকুফ বা কমানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ২০২০ সালের নির্বাচনে বাইডেন প্রশাসনের শিক্ষাখাতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল।
সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার
যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক সময়ে বর্ণবাদ এবং পুলিশি সহিংসতার ঘটনাগুলো তরুণ ভোটারদের মধ্যে সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রতি গভীর মনোযোগ তৈরি করেছে। ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের পর তরুণরা আরও বেশি সচেতন হয়ে উঠেছেন এবং তারা এমন প্রার্থীদের সমর্থন করে যারা বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ান-আমেরিকান কমিউনিটির প্রতি বিদ্বেষমূলক অপরাধ, অভিবাসন আইন সংস্কার, এবং নারী অধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে তরুণ ভোটাররা মানবাধিকার এবং বৈচিত্র্যের সমর্থনে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছেন।
স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসিক স্বাস্থ্য
তরুণ ভোটারদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তরুণ প্রজন্ম স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্যতা ও ব্যয়ের বিষয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, কারণ স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা এবং উচ্চ ব্যয়ের ফলে তাদের জীবনমান হ্রাস পাচ্ছে। অনেক তরুণ মনে করেন যে মানসিক স্বাস্থ্য একটি মৌলিক অধিকার এবং তারা চান তাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা উন্নত হোক। তরুণ ভোটারদের এই প্রয়োজন মেটাতে প্রচারণায় অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় তরুণ ভোটারদের প্রভাব
তরুণদের ভোটকে লক্ষ্য করে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলই বিভিন্ন নতুন কৌশল গ্রহণ করছে। সামাজিক মাধ্যম, ইউটিউব এবং টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে তারা বিভিন্ন প্রচারণা চালায়। ২০২০ সালের নির্বাচনে এই ধরনের প্রচারণার প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, যেখানে বাইডেন প্রশাসন তরুণদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষাসংস্কার, এবং স্বাস্থ্যসেবার মতো ইস্যুতে পরিকল্পনা তুলে ধরে। এটি তরুণ ভোটারদেরকে বেশি করে আকৃষ্ট করেছিল এবং তারা ব্যাপকভাবে এই প্রচারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।
তরুণদের কাছে পৌঁছানোর জন্য প্রচার মাধ্যমেও নানা কৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে। ভিডিও ব্লগ, ইনফোগ্রাফিক্স, এবং বিনোদনধর্মী প্রচারণার মাধ্যমে প্রার্থীরা তরুণদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হচ্ছেন। এই ধরনের প্রচারণা কেবল ভোটারদের সচেতন করে না, বরং তাদের সাথে একটি সংযোগও তৈরি করে যা নির্বাচনে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে তোলে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ এই প্রজন্ম প্রযুক্তি-প্রভাবিত এবং তাঁরা নতুন ধরণের সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার মাধ্যমে রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছে। একদিকে তরুণদের সমর্থন প্রাপ্তি রাজনীতিবিদদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ তারা প্রগতিশীল এবং উদার নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যা ভবিষ্যতের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে তরুণদের ভোটদানে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, তারা কখনো কখনো রাজনীতি ও ভোটদান প্রক্রিয়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, এবং অন্যান্য সামাজিক সমস্যার কারণে তারা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করতে পারেন। এছাড়া তরুণদের মাঝে প্রায়ই নির্বাচনকালীন সময়ে ভোটদানে অনাগ্রহ দেখা যায়, যা তাদের ভোটার টার্নআউটকে প্রভাবিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ভূমিকা বর্তমান এবং ভবিষ্যতের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। তাদের সচেতনতা, প্রিয় ইস্যুগুলোতে আগ্রহ এবং সাংগঠনিক দক্ষতা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলোতে তাদের অবস্থান রাজনৈতিক প্রার্থীদেরও বাধ্য করছে তাদের নীতিগুলো পুনর্বিবেচনা করতে। তরুণদের মধ্যে আরও সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভোটদানে তাদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।







