নব্বইয়ের দশকে শেষভাগ এবং দুই হাজার সালের শুরুর দিকে, বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট আজকের মতো ছিল না। ইন্টারনেট তখনও বিলাসিতা, হাতে হাতে মোবাইল ফোন পৌঁছায়নি। সেসময়ে কিশোর-তরুণদের কাছে রোমাঞ্চের এক অনন্য নাম ছিল পাড়ার মোড়ে ‘ভিডিও গেমের দোকান’। নীল বা লাল কাপড়ের পর্দা দিয়ে ঘেরা সেই ছোট ছোট অন্ধকার ঘরগুলোতে চলত এক অন্য জগতের শাসন। সেই জগতের অবিসংবাদিত সম্রাট ছিল— ‘মোস্তফা’।
বিশ্বের কাছে এই গেমটির অফিসিয়াল নাম ‘Cadillacs and Dinosaurs’। ১৯৯৩ সালে জাপানি গেম জায়ান্ট Capcom (ক্যাপকম) এটি বাজারে ছাড়ে। গেমটি মূলত মার্ক শুলৎজের জনপ্রিয় কমিক বুক সিরিজ ‘Xenozoic Tales’-এর উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল।
কিন্তু বাংলাদেশে এই গেমের প্রেক্ষাপট বা আসল নাম নিয়ে কারো মাথাব্যথা ছিল না। গেমের চারটি চরিত্র ছিল— জ্যাক টেনরেক, হ্যানা ডান্ডি, মোস্তফা কায়রো এবং মেস ও’ব্রায়েন। এদের মধ্যে হলুদ টুপি আর সবুজ শার্ট পরা আফ্রিকান-আমেরিকান চরিত্র ‘মোস্তফা কায়রো’ ছিল গেমারদের প্রধান পছন্দ। তার ক্ষিপ্রতা, দুর্দান্ত ‘ফ্লাইং কিক’ আর স্লাইডিং অ্যাটাক কিশোরদের এতই প্রিয় ছিল যে, তারা পুরো গেমের নামই দিয়েছিল ‘মোস্তফা’। আজও বাংলাদেশের বড় একটা অংশের গেমপ্রেমীর কাছে এটি ‘মোস্তফা গেম’ নামে অমর।
সেসময়ের ভিডিও গেমের দোকানগুলো ছিল এক অদ্ভুত জায়গা। কাঠের তৈরি বড় বড় ক্যাবিনেট বা মেশিন, যার ভেতরে থাকত একটি টেলিভিশন স্ক্রিন আর বাইরে বড় বড় জয়স্টিক ও বাটন। এক একটি মেশিনের সামনে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো ১০-১৫ জন কিশোর। একজন খেলছে, বাকিরা রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে— এই ছিল তখনকার চিরচেনা দৃশ্য।

ভিডিও গেমের সেই খুপরি দোকানগুলোর ভেতরটা ছিল এক মায়াবী রহস্যে ঘেরা। আবছা অন্ধকারে বড়দের সস্তার সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলী, জং ধরা কয়েনের গন্ধ আর স্পিকার থেকে ফেটে আসা সেই চেনা যান্ত্রিক সুর— সবমিলিয়ে জায়গাটা কিশোর মনে এক নিষিদ্ধ কিন্তু রুদ্ধশ্বাস অ্যাডভেঞ্চারের শিহরণ জাগাত। সেসময়ে ভিডিও গেম খেলাকে সমাজ বা পরিবার খুব একটা ভালো চোখে দেখত না। ফলে এই গেম খেলা ছিল অনেকটা ‘নিষিদ্ধ কিছু’ করার মতো।
গেম খেলার জন্য প্রয়োজন হতো ১ থেকে ৫ টাকার কয়েন। তখনকার দিনে ২ টাকা অনেক বড় অংক। স্কুলের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে সেই জমানো ১, ২ কিংবা ৫ টাকার কয়েন যখন আর্কেড মেশিনের সরু ফুটো দিয়ে ভেতরে দেয়া হতো, যে শব্দ হতো, সেটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সংগীত।
অনেকেরই শৈশব স্মৃতিতে আছে গেম খেলার নেশায় পড়ে বাবা-মায়ের পকেট থেকে চুপিচুপি টাকা সরানোর গল্পও। ধরা পড়লে জুটত কড়া শাসন, কানমলা কিংবা বেদম পিটুনি। কিন্তু সেই ব্যথা মুছে যেত গেমের স্ক্রিনে মোস্তফার এক একটি লাথির সাথে। কোচিং বা স্কুল ফাঁকি দিয়ে গেমিং শপে গিয়ে ধরা খাওয়ার ভয় আর ভয়কে জয় করে খেলার যে আনন্দ, তা আজকের গেমিং কনসোলে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
ক্যাপকম কোম্পানি এই বিট-‘এম-আপ গেমের চারটি চরিত্রকে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়ে সাজিয়েছিল:
-
মোস্তফা কায়রো (Mustapha Cairo): গেমের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র। তার মূল শক্তি ছিল গতি। তার স্লাইডিং অ্যাটাক দিয়ে স্ক্রিনের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে থাকা শত্রুদের ধরাশায়ী করা যেত।
-
জ্যাক টেনরেক (Jack Tenrec): সে ছিল গেমের মূল নায়ক, কিন্তু বাংলাদেশের গেমারদের কাছে ছিল দ্বিতীয় পছন্দ। ব্যালান্সড চরিত্র ছিল— শক্তি ও গতির দারুণ সমন্বয়।
-
হ্যানা ডান্ডি (Hannah Dundee): একমাত্র নারী চরিত্র। সে ছুরি চালানোয় পারদর্শী ছিল, কিন্তু গেমাররা সাধারণত তাকে খুব কমই বেছে নিত।
-
মেস ও’ব্রায়েন (Mess O’Bradovich): বিশাল দেহের এক দানবীয় চরিত্র। তার গতি ছিল খুব কম, কিন্তু এক এক ঘুষিতে শত্রুর অর্ধেক জীবন শেষ করে দেয়ার ক্ষমতা রাখত।

গেমটির গল্প আবর্তিত হয়েছিল ২৫তম শতাব্দীকে কেন্দ্র করে। যেখানে পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে মানুষ পাতালে আশ্রয় নেয় এবং শতশত বছর পর উপরে এসে দেখে পৃথিবী এখন ডাইনোসরদের দখলে। কিন্তু কিছু অসাধু লোক (Black Marketeers) ডাইনোসরদের শিকার করে জিন পরিবর্তন করে মিউট্যান্ট বানাচ্ছে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতেই আমাদের চার নায়ক মাঠে নামত।
গেমের নাম অনুযায়ী, এতে একটি নীল রঙের ১৯৫৩ সালের Cadillac Series 62 গাড়ি ছিল। তৃতীয় লেভেলের সেই গাড়ি চালিয়ে ডাইনোসর আর ভিলেনদের পিষে দেয়ার উত্তেজনা ছিল অনন্য।
গেমটিতে মোট আট লেভেল ছিল। প্রতিটি লেভেলের শেষে থাকতো এক একজন ভয়ংকর ‘বস’ (Boss)।
-
ভাইস টারহিউন (Vice Terhune): প্রথম লেভেলের বস, যে ডাইনোসরদের ধরে খাঁচায় ভরছিল।
-
বুচার (Butcher): দ্বিতীয় লেভেলের এই বস ছিল বিশাল মোটা এবং হাতে ছিল দুটি ধারাল চাপাতি। তাকে মারতে গিয়ে অনেকের কয়েন শেষ হয়ে যেত।
-
স্লাইস (Slice): চতুর্থ লেভেলের বস, যে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বুমেরাং ছুঁড়ত।
-
ডক্টর ফেসেডিন (Dr. Fessenden): চূড়ান্ত লেভেলের বস, যে নিজেই একটি দানবীয় মিউট্যান্টে পরিণত হয়।

কয়েন ফুরিয়ে আসার সময় যখন স্ক্রিনে ‘Continue? 10, 9, 8…’ লেখাটি ভেসে উঠত, তখন গেমারের পকেট আর কলিজা দুটোই সমানভাবে কাঁপত। পকেটে আর ৫ টাকার কয়েন নেই মানেই যুদ্ধের অবসান এবং ভগ্নহৃদয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া।
সেসময়ে প্রতিটি এলাকায় দুই-একজন এমন গেমার থাকত, যারা মাত্র একটি ৫ টাকার কয়েন দিয়ে গেমটির আট লেভেল শেষ করতে পারত। তাদেরকে বলা হতো ‘ওস্তাদ’ বা ‘মাস্টার’। যখন কোন ওস্তাদ খেলতে বসত, তার চারধারে জটলা লেগে যেত। সে কীভাবে বসদের মারছে, কীভাবে গ্রেনেড বা মেশিনগান ব্যবহার করছে— তা দেখার জন্য বাকিরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে থাকত। সেই ‘ওস্তাদ’ হওয়া ছিল এক বিরাট সম্মানের ব্যাপার।
২০০৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশে দ্রুত কম্পিউটার এবং গেমিং কনসোল (যেমন: প্লে-স্টেশন) জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ধীরে ধীরে পাড়ার সেই ভিডিও গেমের দোকানগুলো হারিয়ে যেতে থাকে। আর্কেড মেশিনগুলো ভেঙে লোহালক্কড় হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয় কিংবা গুদামে পড়ে থেকে মরচে ধরে নষ্ট হয়ে যায়।
আজ পিসি বা ফোনে এমুলেটর দিয়ে খুব সহজেই মোস্তফা গেম খেলা যায়। সেখানে কয়েন ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় নেই, বাবা-মায়ের হাতে ধরা পড়ার সেই রোমাঞ্চও নেই। আছে শুধু কিছু পিক্সেল। কিন্তু সেসময়ের সেই ৫ টাকার কয়েনের মূল্য আর আজ ফ্রিতে পাওয়া গেমের মধ্যে আসমান-জমিন পার্থক্য।
‘মোস্তফা’ কেবল একটি গেম ছিল না, এটি ছিল নব্বই দশকের কিশোরদের শৈশবের এক রঙিন ক্যানভাস। স্কুল পালানো, টিফিনের পয়সা বাঁচানো, বন্ধুর সাথে ডাবলস খেলা আর জমানো অর্থে ৫ টাকার কয়েন কেনা— এই সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক বিশুদ্ধ আনন্দ।
আজ আমরা হয়তো অনেক দামী গেম খেলি, কিন্তু সেই অন্ধকার দোকানে জয়স্টিক নাড়ানোর সময় যে শিহরণ জাগত, তা আর কখনও ফিরে আসবে না। মোস্তফা গেমটি তাই বাংলাদেশের এক প্রজন্মের কাছে শুধু একটি সফটওয়্যার কোড নয়, বরং এটি তাদের হারিয়ে যাওয়া কৈশোরের একটি মহামূল্যবান টাইম মেশিন।








