মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস কমিয়েছে জাতিসংঘ (ইউএন)। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের প্রভাব এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) প্রকাশিত সর্বশেষ পূর্বাভাসে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগ (ডিইএসএ) জানিয়েছে, চলতি বছরে বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ২ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে।
এর আগে জানুয়ারিতে জাতিসংঘের অর্থনীতিবিদরা ২০২৬ সালে ২ দশমিক ৭ শতাংশ এবং পরের বছরে ২ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
পূর্বাভাস কমানোর কারণ হিসেবে ডিইএসএ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবং বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ডিইএসএর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক শান্তনু মুখার্জি বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করার পর এটি প্রথমে জ্বালানি বাজারে আঘাত হিসেবে দেখা দিলেও পরে তা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিস্তৃত ধাক্কায় রূপ নেয়, যার পরিধি, মাত্রা ও স্থায়িত্ব এখনো অনিশ্চিত এবং এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, বর্তমান পূর্বাভাসে ধরে নেওয়া হয়েছে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে তেলের দাম কিছুটা কমতে শুরু করবে এবং সরকারগুলো জ্বালানি মজুত ব্যবহার করে আংশিকভাবে সংকট মোকাবিলা করতে পারবে।
তবে ‘বিরূপ পরিস্থিতি’ তৈরি হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ২ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মুখার্জি। তার ভাষ্য, এমন পরিস্থিতি হলে এটি হবে চলতি শতাব্দীর অন্যতম দুর্বল অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স, যা শুধু কোভিড-১৯ মহামারি ও ২০০৭-২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময়ের সঙ্গে তুলনীয়।
সংবাদ সম্মেলনে শান্তনু মুখার্জি বলেন, বর্তমান পরিসংখ্যানে উল্লেখযোগ্য মাত্রার অনিশ্চয়তা রয়েছে। আর এই অনিশ্চয়তাই অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি আরও বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ বছর এসব দেশের প্রবৃদ্ধি মহামারিপূর্ব গড়ের তুলনায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট কম হতে পারে, যেখানে বৈশ্বিক অর্থনীতির সামগ্রিক গড় হ্রাস ০ দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট।
আঞ্চলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালে পশ্চিম এশিয়ায় সবচেয়ে বড় ধীরগতির আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। অঞ্চলটির প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ৪ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশে নামানো হয়েছে।
এ ছাড়া ক্যারিবীয় অঞ্চল, পশ্চিম আফ্রিকা, মধ্য আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যের চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসও ০ দশমিক ৪ থেকে ০ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কমানো হয়েছে।
তবে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। চলতি বছরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশ এবং চীনের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হবে বলে ধারণা করছে জাতিসংঘ।
যদিও গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর যুদ্ধ আপাতত স্থগিত রয়েছে, তবু ইরানি হামলার আশঙ্কায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে বিশ্বব্যাপী তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র ১০টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে, যেখানে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ এ পথে যাতায়াত করত।
এর আগে গত এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)ও বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশে নামিয়েছিল।







