বিশ্বের সবচেয়ে দামি গাড়ি কোম্পানির শেয়ার যখন ধীরে ধীরে তলানিতে পৌঁছায়, তখন বিনিয়োগকারীদের মনে প্রশ্ন জাগে এটি কি সাময়িক ধাক্কা, নাকি ইলন মাস্কের টেসলা সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা?
মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে টেসলার বাজারমূল্য ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে ৮৪৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা প্রায় ৪৫% হ্রাস। কোম্পানিটির শেয়ার দর কমার পেছনে একাধিক কারণ থাকলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেসলার মূল ব্যবসা—বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি—সেখানে বড় ধাক্কা লেগেছে।
ইলন মাস্কের ‘স্বপ্নের’ পিছে বিনিয়োগ, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। টেসলার বাজারমূল্যের অধিকাংশই এতদিন নির্ভর করেছে ইলন মাস্কের ভবিষ্যদ্বাণীর ওপর। মাস্ক বারবার বলেছেন, টেসলা শুধুমাত্র একটি গাড়ি কোম্পানি নয়, এটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় পরিবহনের ভবিষ্যৎ।
২০১৬ সাল থেকে প্রতিবছর মাস্ক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে পরের বছরই সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় রোবোট্যাক্সি রাস্তায় নামবে। কিন্তু ২০২৫ সালেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তব হয়নি। এই মুহূর্তে টেসলার আয়ের ৯০% গাড়ি বিক্রি থেকে আসে, অথচ কোম্পানির বাজারমূল্যের বড় অংশই নির্ভর করে স্বচালিত গাড়ি, রোবোট্যাক্সি এবং হিউম্যানয়েড রোবটের মতো প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর।
একসময় বাজারের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল টেসলার, কিন্তু এখন তা নড়বড়ে। ২০২৪ সালে টেসলা ১.৮ মিলিয়ন গাড়ি বিক্রি করেছে, যেখানে বিশ্বের শীর্ষ ৯টি গাড়ি কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ৪৪ মিলিয়ন গাড়ি বিক্রি করেছে। চীনা কোম্পানি বিওয়াইডি গত বছর টেসলাকে টপকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইভি প্রস্তুতকারক হয়েছে। টেসলার ‘মডেল ৩’ ও ‘মডেল ওয়াই’ গাড়ির চাহিদা কমে যাওয়ায় কোম্পানিকে দফায় দফায় দাম কমাতে হয়েছে। সাইবার ট্রাকের বিক্রিও আশানুরূপ হয়নি। মাস্ক বলেছিলেন ২০২৫ সালের মধ্যে ২.৫ লাখ ইউনিট উৎপাদন হবে, অথচ ২০২৪ সালে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩৮,৯৬৫ ইউনিট।
টেসলার শেয়ারের ধসের পেছনে ইলন মাস্কের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাস্ক ২৫০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছেন এবং এখন তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা। অনেক বিনিয়োগকারী মনে করছেন, রাজনীতিতে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়ায় মাস্ক টেসলার মূল ব্যবসায় ফোকাস হারাচ্ছেন। মাস্কের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে ইউরোপের বাজারে টেসলার বিক্রি ব্যাপকভাবে কমেছে, কারণ সেখানে তিনি কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। স্বায়ত্তশাসিত গাড়ির স্বপ্ন নাকি বিনিয়োগকারীদের বিভ্রম? মাস্ক এখন মডেল ২ নামের সস্তা ইভি প্রকল্প বাতিল করে সম্পূর্ণভাবে রোবোট্যাক্সির দিকে ঝুঁকছেন।
কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, টেসলার রোবোট্যাক্সি প্রযুক্তি এখনও নিরাপদ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে টেসলার ‘ফুল সেল্ফ ড্রাইভিং’ সফটওয়্যার সংক্রান্ত দুর্ঘটনার তদন্ত চলছে। বিওয়াইডি এবং অন্যান্য চীনা কোম্পানিগুলো এখন স্বচালিত গাড়ির প্রযুক্তি বিনামূল্যে দিতে শুরু করেছে, যা টেসলার ব্যবসার জন্য বড় হুমকি হতে পারে।
টেসলার শেয়ারের প্রাইস-টু-আর্নিংস রেশিও এখনও ৯ গুণ বেশি, যা তার প্রতিদ্বন্দ্বী গাড়ি কোম্পানিগুলোর তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে উঁচু। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান জেপি মরগান বলছে, বাজারে একসময় বাস্তবতা ফিরে আসবেই। টেসলার শেয়ারদর কমার এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।
টেসলা এখনো বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান কোম্পানি। কিন্তু তার মূল্য কতটা যৌক্তিক? ইলন মাস্কের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব হবে? বিনিয়োগকারীরা যদি তার স্বপ্নের ওপর আস্থা হারান, তাহলে টেসলার শেয়ার আরও নিচে নামতে পারে। এখন দেখার বিষয়, টেসলা কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, নাকি এটি প্রযুক্তির ইতিহাসের আরেকটি “বুদবুদ” হিসেবে চিহ্নিত হবে?







