ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সংগঠিত অপরাধচক্র এখন হত্যাকাণ্ড পরিচালনায় ক্রমেই কিশোরদের ব্যবহার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের খুঁজে বের করে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এরপর ভিডিও গেমের মতো ধাপে ধাপে নির্দেশনা দিয়ে হত্যার মিশনে পাঠানো হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর ভাষায়, এটি ‘ভাড়ায় সহিংসতা’ মডেলের নতুন রূপ, যা উত্তর ইউরোপ থেকে যুক্তরাজ্য পর্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ইউরোপীয় পুলিশ সংস্থা ইউরোপলের তথ্য অনুযায়ী, সুইডেনভিত্তিক সংগঠিত অপরাধচক্র ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক এই কৌশলের অন্যতম প্রধান ব্যবহারকারী। ২০২২ সালের পর থেকে চক্রটি অন্তত ৩৫টি হত্যাকাণ্ড এবং ইউরোপে ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে একাধিক হামলা ও হামলার চেষ্টার সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভুল ব্যক্তিকে হত্যা
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্টকহোমের একটি উপশহরে ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মুরাদ আবদেলকাদেরকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। ম্যাকডোনাল্ডসে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তাকে কাছ থেকে একাধিক গুলি করা হয়। শেষ গুলিটি করা হয় মাথায়।
তদন্তে জানা যায়, হামলাকারী ছিলেন ১৮ বছর বয়সী আতিলা আজিমভ। তবে তিনি ভুল ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন। তদন্তকারীদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে ফক্সট্রট নেটওয়ার্কের হয়ে এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিলেন তিনি।
ইরানের সঙ্গে ফক্সট্রটের যোগসূত্র
তদন্তকারীদের মতে, ফক্সট্রট নেটওয়ার্কের নেতা রাওয়া মাজিদ সুইডেন ও পরে তুরস্ক ছেড়ে বর্তমানে ইরানের রাজধানী তেহরানে অবস্থান করছেন।
সুইডিশ সম্প্রচারমাধ্যম এসভিটির অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডায়ামান্ট সালিহু তিন বছর ধরে ফক্সট্রট ও ইরানের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে অনুসন্ধান করছেন। তার দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর মাজিদ তেহরানে আশ্রয় নেওয়ার বিনিময়ে ইরানি সরকারের হয়ে কাজ করতে সম্মত হন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর ইরান সরকার ফক্সট্রট নেটওয়ার্ককে নিজেদের বিরোধী ব্যক্তি, ভিন্নমতাবলম্বী, সাংবাদিক এবং ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার নির্দেশ দেয়।
যুক্তরাজ্য ২০২৫ সালের এপ্রিলে ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক ও এর নেতা রাওয়া মাজিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় কিশোরদের নিয়োগ
ইউরোপলের বিশেষ টাস্কফোর্স ওটিএফ গ্রিম জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের চিহ্নিত করা হয়। এরপর ভিডিও গেমের মতো ধাপে ধাপে নির্দেশনা দিয়ে তাদের হত্যাকাণ্ড পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
ইউরোপলের ইউরোপিয়ান সিরিয়াস অ্যান্ড অর্গানাইজড ক্রাইম সেন্টারের প্রধান অ্যান্ডি ক্রাগ বলেন, অপরাধচক্রগুলো ঝুঁকিপূর্ণ তরুণদের ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডের দায় আউটসোর্স করছে।
বর্তমানে বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্য এই টাস্কফোর্সে যুক্ত রয়েছে।
নরওয়ের কিশোর থেকে যুক্তরাজ্যে হত্যার মিশন
এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রমের অন্যতম আলোচিত উদাহরণ নরওয়ের কিশোর জোহানেস ন্যাটল্যান্ড।
স্বচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠা ন্যাটল্যান্ড মাদকাসক্তি ও মানসিক সমস্যার কারণে একটি শিশু নিবাসে ছিলেন। সেখানে পরিচয় হয় ‘আননোন হাসলার’ নামে পরিচিত আরেক কিশোরের সঙ্গে। সেখান থেকেই তিনি একটি বার্তা পান, যেখানে লেখা ছিল, ‘ইংল্যান্ডে হত্যা, পারিশ্রমিক ২ লাখ ৭০ হাজার নরওয়েজিয়ান ক্রোন।’
পরে ‘জেনারেল’ নামে ১৬ বছর বয়সী আরেক কিশোর তাকে নিয়োগ দেয়। এরপর ‘এজেন্ট ৪৭’ ছদ্মনামধারী ফক্সট্রট সদস্য তার যুক্তরাজ্য যাত্রা, জরুরি পাসপোর্ট সংগ্রহ এবং পুরো অভিযানের সমন্বয় করেন।
সিগন্যাল অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিটি ধাপে নির্দেশনা দেওয়া হয়। হাডার্সফিল্ডে পৌঁছে বনাঞ্চলে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র এবং অন্য স্থানে রাখা নগদ অর্থের অবস্থান ভিডিও ও মানচিত্রের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়।
হোটেলে পৌঁছানোর পর তাকে বার্তা পাঠানো হয়, ‘আগামীকাল আমাদের অনেক কাজ আছে।’
তবে পরদিন সকালে ন্যাটল্যান্ডকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখনও তাকে জানানো হয়নি, কাকে হত্যা করতে হবে। তদন্তকারীরা এখনও নিশ্চিত নন, এটি কেবল অপরাধচক্রের নির্দেশ ছিল, নাকি ইরানের স্বার্থে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, ন্যাটল্যান্ডকে নিয়োগ দেওয়া ‘জেনারেল’ আরও কয়েকজন কিশোরকে একইভাবে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহার করেছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আতিলা আজিমভ, যিনি ভুল ব্যক্তিকে হত্যা করে বর্তমানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। এছাড়া ১৭ বছর বয়সী আরেক কিশোর সুইডেনে আহমেদ জামজামকে গুলি করে হত্যা করেন।
তবে প্রতিশ্রুত অর্থ কেউই পাননি। হত্যাকাণ্ডের পরপরই তারা গ্রেপ্তার হন।
সাংবাদিক ডায়ামান্ট সালিহুর মতে, এটিও ফক্সট্রটের কৌশলের অংশ। কিশোররা ধরা পড়লে তাদের আর পারিশ্রমিক দিতে হয় না। তাই ঝুঁকির পরিণতি কম বোঝে এমন কম বয়সীদেরই ইচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট করা হয়।
ফক্সট্রটের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গঠিত ওটিএফ গ্রিম প্রতিষ্ঠার ১৫ মাসে ২৮০ জনের বেশি সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে অন্যতম আলি শেহাদ আহমেদ, যাকে ‘এজেন্ট ৪৭’ বলে সন্দেহ করছে সুইডিশ পুলিশ। তাকে ইরাকের কুর্দি অধ্যুষিত সুলাইমানিয়াহ শহরে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে তাকে সুইডেনে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া চলছে।
এছাড়া চলতি বছরের মে মাসে তিউনিসিয়ায় ফক্সট্রটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও সাবেক র্যাপার মোহাম্মদ মোয়েগলি মোহদিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হুমকি এখনো রয়ে গেছে
সুইডিশ পুলিশের উপ-জাতীয় কমিশনার স্টেফান হেক্টর বলেছেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো হচ্ছে, যাতে অপরাধীরা বিশ্বের কোথাও নিরাপদ আশ্রয় না পায়।
তবে তদন্তকারীদের ধারণা, ফক্সট্রটের নেতা রাওয়া মাজিদ এখনও ইরানে অবস্থান করছেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডায়ামান্ট সালিহুর আশঙ্কা, যতদিন এই নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকবে, ততদিন ইরান সরকারের শত্রু হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের ওপর হামলার ঝুঁকিও অব্যাহত থাকবে।
এদিকে, ফক্সট্রটের প্রতিদ্বন্দ্বী ডালেন নেটওয়ার্কসহ আরও কয়েকটি অপরাধচক্রও কিশোরদের ভাড়াটে খুনি হিসেবে ব্যবহার করার একই কৌশল গ্রহণ করেছে। ফলে ইউরোপজুড়ে এই নতুন অপরাধপ্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।







