চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Group

চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি সময়ের দাবী

Nagod
Bkash July

এখনকার বাড়তি মূল্যের বাজারে একজন মানুষ যদি সকালের নাস্তা ঘরেও করেন তাতেও ন্যূনতম খরচ ৩০ থেকে ৪০ টাকা। এই নাস্তায় যে খুব বেশি মেন্যু থাকে তা নয়। হিসাবে যদি সাধারণত ঘরে বানানো দুটো আটার রুটি, তরকারি আর চা ধরা হলেও সর্বনিম্ন খরচ এটি।

আমি একজন আইনজীবী। সকালে নাস্তার খরচের সাথে কোর্টে আসা যাওয়ার খরচ যোগ হয় আরও ১৮০ টাকার মতো। যাওয়ার সময় সিএনজি দ্রুত যাওয়ার জন্য। আসার সময়ে লোকাল বাস বা টেম্পু। যারা চাকরি করেন তাদেরও প্রায় একই খরচ হয় অফিসে আসা যাওয়ার জন্য। এর সাথে আমার চেম্বার খরচ গড়ে ১০০ টাকা পত্রিকা, চায়ের বিল ইত্যাদি মিলে। দুপুরে হোটেলে খেলে খরচ কম করে হলেও ১০০/১২০ টাকা। এই টাকায় আহামরি কোনো খাবার পাওয়া যায় তাও নয়।

এরপর বিকেলে তেমন কিছু খাওয়া হয় না। তবে শুধু চা বিস্কুট। এতেও খরচ হয় অন্তত ৩০/৪০ টাকা। এর সাথে দিনে আরও কিছু স্বাভাবিক খরচ রয়েছে। রাতে বাসায় খেলেও এখনকার বাজারে সেটাও ১০০/১৫০ টাকার কম নয়।

ওপরের হিসেব একেবারে মিনিমাম খরচ একজন সাধারণ মধ্যবিত্তের বর্তমান বাজারে। যা দৈনিক প্রায় ৫০০/৬০০ টাকার মতো। এ হিসাব দেওয়ার কারণ কী?

এই হিসাব দেওয়ার কারণ হলো বর্তমান বাজার মূল্যে একজন সাধারণ নাগরিকের দৈনিক খরচ হয় ৫০০ টাকার ওপরে। তাহলে একজন চা শ্রমিক? তারা দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করে ২৩/২৪ কেজি চায়ের পাতা সংগ্রহ করলে পান ১২০ টাকা। এর মধ্যে যদি দুটি পাতা আর একটি কুড়ি ছাড়া অন্য চা পাতা থাকে তাহলে সেটা কাউন্ট হবে না। তাতে মাসিক ইনকাম দাঁড়ায় ১২০x২৬= ৩১২০ টাকা। তাও যদি প্রতিদিন ২৩ কেজি পাতা সংগ্রহ করতে পারেন তাহলে।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তাদের দৈনিক খাবারের খবর দেখলে গা শিউরে ওঠার মতো অবস্থা। এদের সকাল শুরু হয় লবণ চা আর দুটি বনরুটি দিয়ে। দুপুরের চাপাতা ভর্তা আর ভাত। সন্ধ্যায় সেই লবণ চা আর বনরুটি। রাতে আবার সেই চাপাতা ভর্তা আর ভাত।

এই ৩১২০ টাকাতেই চলে একজন চা শ্রমিকের পুরো পরিবারের এক মাসের খাওয়া দাওয়া , চিকিৎসা খরচ সবকিছু। বিনোদন সেখানে বিলাসিতা মাত্র। বাংলাদেশে এখন ১৬৮টি বাণিজ্যিক চা উৎপাদনের বাগান কাজ করছে। যেখানে ১ দশমিক ৫ লাখেরও বেশি লোকের কর্মসংস্থান রয়েছে।

অথচ শত শত কোটি টাকার সম্পদের অধীশ্বর এদেশের চা বাগানের মালিকেরা। এদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানী দ্রব্যও এটি। যার রপ্তানী থেকে অর্জিত অর্থে চলে দেশের টিকে থাকার চাকা। বিশ্বে চা রপ্তানীকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। যা থেকে আসে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রায় প্রতি অর্থবছরে। বাংলাদেশে এখন ১৬৮টি বাণিজ্যিক চা উৎপাদনের বাগান কাজ করছে। যেখানে দেড় লাখেরও বেশি লোকের কর্মসংস্থান রয়েছে। উপরন্তু, বাংলাদেশ বিশ্বের ৩ শতাংশ চা উৎপাদন করে। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি চায়ের বাজারের মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৫শ কোটি টাকা, জিডিপিতে এই শিল্পের অবদান প্রায় ১ শতাংশ।

যে চায়ের সুবাস ছাড়া আমাদের মতো ছাপোষা মধ্যবিত্তের পর্যন্ত দিন শুরু হয় না, হয় না ঘরোয়া আড্ডা আর মেহমানদারী, সেই চা শ্রমিকরা আজ আন্দোলনে নেমেছেন স্রেফ ১৮০ টাকা বৃদ্ধি করে ৩০০ টাকা বেতন নির্ধারণ করে বেচেঁ থাকার অধিকারের দাবীতে। তাদের এ আন্দোলন যৌক্তিক। বরং এখনকার বাজার দর অনুযায়ী এর চেয়েও বেশি মজুরি এবং সুযোগ সুবিধা দেওয়া যায় কিনা সেই বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে।

অথচ এ বিষয়ে কারও যেন কোনো বিকার নেই। হীরক রাজার দেশের ছবির সেই গানটি মনে পড়ে?

“সোনার ফসল ফলায় যে তার , দুই বেলা জোটেনা আহার্।
হীরার খনির মজুর হয়ে কানাকড়ি নাই।
ভাইরে ভাইরে।
আমি কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়”

চা শ্রমিকদের বেতন না বাড়ার পেছনে মজুরি বোর্ড এর ভূমিকাও কম নয়। সিলেট টুডে পত্রিকার প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী: ‘২০১০ সালে মজুরি বোর্ড চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৪৮ টাকা নির্ধারণ করে। প্রতি পাঁচ বছর পর শ্রমিকদের মজুরি নতুন করে নির্ধারণ করার কথা থাকলেও ন্যূনতম মজুরি বোর্ড তা করেনি। তাই মালিকপক্ষের সাথে প্রতি দুই বছর পর পর চুক্তির মাধ্যমে ৪৮ টাকা থেকে ১২০ টাকায় মজুরি উন্নীত করে চা শ্রমিকরা।

সবশেষ ২০২১ সালের ১৩ জুন দীর্ঘ ১১ বছর পর চা শিল্প খাতে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গেজেট আকারে খসড়া মজুরির ১২০টাকা সুপারিশ প্রকাশ করে। কিন্তু এর আগেই মালিক ও শ্রমিক পক্ষের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১২০ টাকা মজুরি কার্যকর হয়েছে। তাই ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি চা শ্রমিকরা। চা শ্রমিকরা এবং তাদের সংগঠনগুলো এই খসড়ার প্রতিবাদ করে আসছেন ওই সময় থেকেই। কিন্তু তাতেও টনক নড়েনি মজুরি বোর্ড কর্তৃপক্ষের। চলতি বছর জুন মাসের শেষ দিকে মজুরি বোর্ডর সর্বশেষ মিটিংয়েও ১২০ টাকা মজুরির সুপারিশ করে মজুরি বোর্ড। মজুরি বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে আগামী ৫ বছর ১২০ টাকা দৈনিক মজুরিতে কাজ করতে হবে চা শ্রমিকদের।’

সেজন্য বলতে চাই, ৩০০ নয়, এখনকার উর্ধ্বমূল্যের বাজারে ন্যূনতম ৫০০ টাকা করা হোক চা শ্রমিকদের মজুরি। মানুষের মতো করে বেচেঁ থাকার এটুকু অধিকার দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের অবশ্যই প্রাপ্য। এই প্রাপ্য অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করার মতো মহাপাপের লাইসেন্স নেই কারোরই।

হে মহান শিল্পপতি, কী এমন ক্ষতি হবে আপনার লভ্যাংশ যদি একটু কমই হয়? আপনার গুলশানের বাড়ী, গ্যারেজের মার্সিডিজ গাড়ী আর ক্লাবের হুইস্কির ফোয়ারা; কিছুতেই তো টান পড়ে যাবে না এই সামান্য সহানুভূতিটুকু দেখালে। এতে বরং ভাতের পাতে চা পাতা সিদ্ধ ছাড়াও অন্য একটু সবজি বা ডাল যুক্ত হবে হাজারও মানুষের পাতে।

অবিলম্বে চা শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির ন্যায্য দাবী পূরণ করা হোক।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

BSH
Bellow Post-Green View