‘কূল নাই দরিয়ার মাঝে বৃক্ষ একটি মনোহর’ খ্যাত প্রখ্যাত বাউল শিল্পী সুনীল কর্মকার আর নেই। ময়মনসিংহ মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শুক্রবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
সুনীল কর্মকারের মৃত্যুর খবরটি চ্যানেল আই অনলাইনকে নিশ্চিত করেন জনপ্রিয় শিল্পী কুদ্দুস বয়াতি।
তিনি বলেন, “সুনীল আজ ভোরে মারা গেল, অথচ গত রাতেই আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। ভিডিও কলে তার মেয়ে আমাকে সুনীলের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়। অক্সিজেন মাস্ক পরেই সে আমার সঙ্গে কথা বলেছে।”
এসময় কুদ্দুস বয়াতি বলেন, তার ছাত্ররা আমার কাছে অনুরোধ করেছিল, সুনীলের জন্য একটা সিট ম্যানেজ করে দিতে। সেটা করার আগেই সে চলে গেল—এই কষ্টটা ভাষায় বোঝানো যাবে না।”
সুনীলের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কুদ্দুস বয়াতি আরও বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে চিনতাম। আমি তখন টুকটাক পালাগান করতাম, আর বাউল গান শুরু করেছিল সুনীল। তখন থেকেই আমাদের একসঙ্গে পথচলা। কত গান, কত আসর, কত স্মৃতি—সব মিলিয়ে সে শুধু সহশিল্পী না, আমার জীবনের অংশ।”
এদিকে সুনীল কর্মকারের শিষ্য সুমন বাঁশিওয়ালা মৃত্যুসংবাদ পেয়ে সকালেই ছুটে যান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি জানান, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে জেনেছেন—তিন দিন আগে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন সুনীল কর্মকার। প্রস্রাব-পায়খানায় জটিলতা ছিল। তবে গত রাতেও সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেছেন। ভোরেই হঠাৎ করে তার মৃত্যু হয়।
সুমন বাঁশিওয়ালা আরও জানান, জীবদ্দশায় নিজের দেহ সৎকার নিয়ে স্পষ্ট ইচ্ছা প্রকাশ করে গিয়েছিলেন সুনীল কর্মকার। তিনি বলে গিয়েছিলেন, মৃত্যুর পর যেন তাকে পোড়ানো না হয়, সমাধিস্থ করা হয়। শিল্পীর সেই শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী আজ শুক্রবার বিকেল ৪টায় ময়মনসিংহের গৌরীপুরে তাকে সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবার।
এ বিষয়ে জানতে সুনীল কর্মকারের ব্যবহৃত মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে ফোনটি রিসিভ করেন তার ছাত্র মোশাররফ। তিনি জানান, গুরু সুনীলের শেষ ইচ্ছে ছিলো সমাধিস্থ হওয়া৷ তাঁর ইচ্ছে অনুযায়ি গৌরীপুরের কলতাপাড়ায় আজ বিকেল ৪টায় সমাধিস্থ করা হবে।
নেত্রকোনায় জন্ম নেওয়া সুনীল কর্মকার মাত্র সাত বছর বয়স থেকেই গানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভরাট ও আবেগময় কণ্ঠে যেকোনো আসর একাই মাতিয়ে তুলতে পারতেন তিনি। কেবল কণ্ঠ নয়—বেহালা, দোতারা, তবলা ও হারমোনিয়ামসহ একাধিক বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারদর্শী ছিলেন এই বাউল শিল্পী।
বিখ্যাত বাউলশিল্পী ওস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁর গান শুনেই গানের জগতে নিজেকে সঁপে দেন সুনীল কর্মকার। ওস্তাদ জালাল উদ্দিন খাঁর অসংখ্য গানে তিনি সুর করেছেন এবং কণ্ঠ দিয়েছেন। এর মধ্যে বহু গান শ্রোতামহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। পাশাপাশি নিজের লেখা প্রায় দুই শতাধিক গানও রয়েছে তার ঝুলিতে।
দৃষ্টিহীন এই শিল্পীর লোক সংগীতে অবদানের জন্য ২০২২ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রদত্ত শিল্পকলা পদক লাভ করেন।








