সেউতায় অভিবাসীদের ব্যাপক প্রবেশকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দুই সদস্য স্পেন ও ইতালির মধ্যে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। এর জেরে ইতালি থেকে স্পেনে আসা সব ধরনের বিমান ও সমুদ্রপথের যাতায়াতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ চালু করেছে মাদ্রিদ।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
শুক্রবার (৭ জুলাই) মধ্যরাত থেকে এই নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এক মাসের জন্য তা বহাল থাকবে। এর এক সপ্তাহ আগে মরক্কো থেকে স্পেনের অধীনস্থ সেউতা উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৭৮ হাজার অভিবাসী প্রবেশের পর ইতালিও স্পেন থেকে আগতদের ওপর একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল।
শুক্রবার স্পেন ইতালিকে রোববারের মধ্যে সীমান্ত তল্লাশি প্রত্যাহারের দাবি জানায়। তবে রোম জানিয়েছে, অন্তত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এই নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকবে। ইতালির দাবি, ওই সময় সেউতায় অভিবাসীদের নতুন ঢল নামতে পারে বলে স্পেন আশঙ্কা করছে।
এ নিয়ে স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও ইতালির রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মেলোনি দীর্ঘদিন ধরেই ইইউতে আরও কঠোর অভিবাসন নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন।
স্পেন ও ইতালির মধ্যে কোনো স্থলসীমান্ত নেই। ইতালির সরকার গত সপ্তাহে বলেছিল, শেনজেন চুক্তির আওতায় অবাধ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীরা ইতালিতে যেতে না পারেন।
তবে মাদ্রিদ ইতালির এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, এর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। স্পেনের দাবি, সেউতায় প্রবেশ করা অভিবাসীদের শেনজেন অঞ্চলে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই।
শুক্রবার স্পেনের হুমকির জবাবে ইতালি জানায়, তারা কোনো ‘চূড়ান্ত নির্দেশ’ মেনে নেবে না। ইতালির সরকার বলেছে, তৃতীয় দেশের নাগরিকরা স্পেন থেকে ইতালিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে শেনজেন চুক্তির প্রয়োগ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত অন্তত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। ইতালির ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
ইতালির কর্মকর্তারা বলছেন, স্পেন ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের নাগরিকদের জন্য যতটা সম্ভব স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তল্লাশি চালাচ্ছে। স্পেনের নাগরিকদের অতিরিক্ত তল্লাশি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে রোম। এই অতিরিক্ত তল্লাশি শুধু ইইউভুক্ত নয় এমন দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
তবে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পায়েস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কয়েকটি বিমানবন্দরে দীর্ঘ সারি ও অপেক্ষার সময় তৈরি হয়েছে। স্পেন থেকে আসা যাত্রীদের তল্লাশির জন্য নির্দিষ্ট লাইনে পাঠানো হচ্ছে।
অন্যদিকে স্পেনের শুক্রবারের পাল্টা পদক্ষেপের আওতায় ইতালি থেকে আসা যাত্রীদের পাসপোর্ট, জাতীয়তা ও ভিসা পরীক্ষা করা হবে। দেশটির সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অব্যাহত অনিয়মিত অভিবাসনচাপের’ কারণে ইতালি থেকে আসা যাত্রীদের ওপর এই নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
এই তল্লাশি ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে এর সময়সীমা সংশোধন করা হতে পারে।
শেনজেন চুক্তির আওতায় অবাধ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ইতালিও স্লোভেনিয়ার সঙ্গে সীমান্তে বর্তমানে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
ইতালির এক মাসের জন্য শেনজেন চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তকে ফিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক সমর্থন করেছে। অন্যদিকে চেক প্রজাতন্ত্র স্পেনের শেনজেন সদস্যপদ সাময়িকভাবে স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
সেউতায় গত সপ্তাহে প্রবেশ করা অধিকাংশ অভিবাসীকে কয়েক দিনের মধ্যেই ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে প্রায় ১ হাজার ৪০০ অপ্রাপ্তবয়স্ক এখনো সেখানে অবস্থান করছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ‘খুবই অল্পবয়সী ছেলে ও মেয়ে’ বলে জানা গেছে।
মরক্কো থেকে নতুন করে অভিবাসীদের ঢল নামতে পারে বলে স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সতর্কতা জারি করেনি। তবে মরক্কোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের নতুন করে সেউতায় প্রবেশের পরিকল্পনা নিয়ে তৎপরতার কারণে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে এল পায়েসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সংবাদমাধ্যমটিকে জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে গত সপ্তাহের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হবে বলে তারা মনে করছে না।
কেন কয়েক হাজার অভিবাসী একসঙ্গে সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ইইউর অভিবাসনবিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার দাবি করেছেন, অপরাধী চক্রের ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য এ ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। স্পেন সরকারও এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়েছে।
সেউতা ও মেলিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করার সময় সমুদ্রপথে আটক অভিবাসীদের সরাসরি মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না বলে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেওয়ার পরই এই ঘটনা ঘটে।
অন্যদিকে মরক্কো এই সংকটের জন্য স্পেনের আদালতের সিদ্ধান্তকে দায়ী করেছে। দেশটির এক সরকারি সূত্র স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, প্রতিরোধমূলক কাঠামো ভেঙে পড়েছে এবং অপরাধীদের চাপে নয়, একজন বিচারকের সিদ্ধান্তের কারণে বাঁধ ভেঙে গেছে।
একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের সাঁতরে সেউতায় প্রবেশের ঘটনায় মরক্কোর সীমান্তরক্ষীরা কেন তাদের ঠেকানোর চেষ্টা করেনি, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সেউতা ও মেলিয়া দীর্ঘদিন ধরে স্পেন ও মরক্কোর মধ্যে কূটনৈতিক বিরোধের অন্যতম কারণ। মরক্কো এই দুই ভূখণ্ডের ওপর স্পেনের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে না।








