বাংলাদেশের যত সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন তাদের মধ্যে শুধু সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই গণভবনে বসবাস করেছেন। এছাড়া অন্য কোন সরকার কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান সেখানে বসবাস করেননি। যদিও নানাবিধ রাষ্ট্রীয় কাজে গণভবন ব্যবহৃত হয়েছে। শেখ হাসিনা যখন ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তখন তিনি গণভবন বরাদ্দ নিয়ে সেখানে বসবাস করতে শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রীত্ব ছাড়ার পরেও তিনি সেখানে বাস করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে শেখ হাসিনা ২০০১ সালে গণভবন ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।
আজ (৯ সেপ্টেম্বর) সোমবার বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতা থাকাকালীন ২০শে জুন জাতীয় সংসদে ‘জাতির পিতার পরিবার সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন ২০০১’ সংসদে পাশ হয়। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে তার ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা ছিল। এই আইনে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে আজীবন এসএসএফ দ্বারা নিরাপত্তা দেওয়া, পৃথক আবাসন বরাদ্দ ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়।
২০০১ সালের দোসরা জুলাই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনাকে গণভবন বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই আইনের ক্ষমতাবলে শেখ হাসিনাকে গণভবন এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে ধানমন্ডির ছয় নম্বর সড়কে এক বিঘার একটি সরকারি বাড়ি বরাদ্দ দেওয়া হয়। তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে পূর্ত মন্ত্রণালয় বাড়ি বরাদ্দের প্রস্তাব উত্থাপন করে। সেখানে বলা হয় গণভবন তার ব্যক্তি মালিকানাধীন হবেনা, সরকারি মালিকানাধীনই থাকিবে। শেখ হাসিনাকে গণভবন বরাদ্দ দেওয়ার কারণ হিসেবে তার নিরাপত্তার বিষয়টিকে উল্লেখ করা হয়।
‘প্রধানমন্ত্রীকে যে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে তাতে নিরাপত্তা কর্মীরা মনে করেন, গণভবনই তার থাকার জন্য উপযুক্ত স্থান’ তৎকালীন মন্ত্রিসভায় এ যুক্তি তুলে ধরা হয়, যেটি বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, শেখ হাসিনা গণভবনে থাকবেন এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানা ১৯৮১ সালে ১২ই জুন মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিধবা স্ত্রী খালেদা জিয়া যেসব সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন সেগুলো পাবেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, শেখ রেহানা তার নামে বরাদ্দ করা সরকারি বাড়িতে বসবাসের উপযোগী লোকবল ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন। লোকবলের মধ্যে একজন গাড়ি চালক, ব্যক্তিগত সহকারী, বাবুর্চি, মালি, ঝাড়ুদার ও দুইজন বেয়ারার থাকবে। এছাড়া জ্বালানিসহ একটি গাড়ি, সরকারি খরচে টেলিফোন, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস বিল দেওয়া হবে।
গণভবন শেখ হাসিনা থাকার আগে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে এটির নাম ‘গণভবন’ ছিল। পরে সেটিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন করা হয়। এরপর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর সেটির নাম আবারও ‘গণভবন’ করা হয়।
গণভবন নিয়ে বিতর্ক
শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী না থাকলেও গণভবনে বসবাসের জন্য যে বরাদ্দ নিয়েছিলেন, সেটি নিয়ে তখন বেশ বিতর্ক তৈরি হয়। সবচেয়ে বেশি শোরগোল তৈরি হয় বিএনপির তরফ থেকে। বরাদ্দ দেওয়ার কিছু দিন পরে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের সাথে মত বিনিময়কালে শেখ হাসিনার গণভবনে থাকা নিয়ে আপত্তি তোলেন। তখন খালেদা জিয়াকে উদ্ধৃত করে ইত্তেফাক পত্রিকা শিরোনাম করেছিল, ‘নির্বাচন করিতে চাহিলে গণভবন ছাড়ুন।। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ঘনিয়ে আসছিল।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমানের সাথে বৈঠক করে শেখ হাসিনার নামে গণভবন বরাদ্দ বাতিল করার দাবি জানান। বিএনপি যখন শেখ হাসিনাকে গণভবন ছেড়ে দেবার জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছিল, তখন আওয়ামী লীগও পাল্টা কৌশল অবলম্বন করে। আওয়ামী লীগের তরফ থেকে দাবি তোলা হয় খালেদা জিয়া যাতে তার সেনানিবাসের বাড়ি ছেড়ে দেন। এমন অবস্থায় শেখ হাসিনার সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ দিকে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে বাড়ির ইজারা বাতিল করার জন্য কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
তৎকালীন পত্রপ্রিকার খবরে বলা হয়, ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের মন্ত্রিসভার খালেদা জিয়া ও তার দুই ছেলেকে ১০ লক্ষ টাকা নগদ ও অন্যান্য সুবিধা দিয়ে ঢাকা সেনানিবাসে শহীদ মইনুল রোডের বাড়িটি রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে কিছু শর্তে ইজারা দেওয়া হয়। বাড়িটিতে জমির পরিমাণ ছিলে দুই দশমিক ৭২ একর। এই বাড়িতে সেনাপ্রধান ও পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বসবাস করতেন।
গণভবন নিয়ে রিট দায়ের
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গণভবন বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টিকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করার প্রস্তুতি নেয় বিএনপি। তখন তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নিলে মামলা দায়ের করা হবে। অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্ব তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেবার পর শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার নিরাপত্তা আইন ও গণভবন বরাদ্দের বিরুদ্ধে রিট দায়ের করে বিএনপি। দলটির তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া এ রিট আবেদন দায়ের করেছিলেন। এই রিট আবেদন দায়ের করার কয়েকদিনের মধ্যে হাইকোর্ট একটি রুল জারি করে।
রিট পিটিশনে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এই আইন বলবৎ থাকলে আওয়ামী লীগ প্রাধান্য পাবে। ফলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ কলুষিত হবে। যদিও এই রিট নিয়ে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। এরই মধ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও হয়ে যায়। ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। এরপর ডিসেম্বর মাসে ‘জাতির পিতার পরিবার সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন ২০০১ বাতিল করা হয়।
গণভবন ছেড়ে যাওয়া
ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্কের পটভূমিতে শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যেই শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে দেন। এরপর ২০০১ সালে ১৬ই অগাস্ট তিনি গণভবন ছেড়ে যান। শেখ হাসিনা যখন গণভবন ছেড়ে যাচ্ছিলেন তখন তিনি বিএনপি নেতা খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়ি ছেড়ে দেবার আহবান জানান।
শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকা তখন লিখেছিল, তিনি (খালেদা জিয়া) বলেছিলেন আমি গণভবন ছাড়লেই নাকি আমার সাথে আলোচনা করবেন। এখন তিনি ১০১ টাকা দিয়ে সেনানিবাসের যে বাড়ি নিয়েছেন তা ফেরত দিলেই আলোচনা হতে পারে। বাড়ি নিয়ে এতো কথা শুনতে ভালো লাগে না। নেই নাই, নিলাম না।
শেখ হাসিনা তখন দাবি করেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে গণভবন ১০১ টাকার প্রতীকী মূল্যে বাড়ি কিনে নেবার প্রস্তাব উঠেছিল।আমি ঐ প্রস্তাব গ্রহণ করিনি। আমি বলেছিলাম, আমার শুধু থাকার জায়গা হলেই চলবে। সিকিউরিটির লোকেরা বিভিন্ন বাড়ি সার্ভে করে সুগন্ধা, যমুনা বা করতোয়া আমার বসবাসের জন্য নির্ধারণ করে। যমুনার মতো বিলাসবহুল বাড়ির পরিবর্তে আমি করতোয়াকে (পরবর্তীতে গণভবন) বেছে নেই।
পরে ২০০১ সালে গণভবন ছেড়ে যাবার সময় শেখ হাসিনা দাবি করেছিলেন, গণভবন প্রধানমন্ত্রীর বাসস্থান হিসেবে চিহ্নিত ছিল না। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যদি সেটি প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি হিসেবে চিহ্নিত থাকে তাহলে শাহ আজিজ, মওদুদ আহমদ ও খালেদা জিয়া গণভবন ব্যবহার করেননি কেন?

গণভবনের ইতিবৃত্ত
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সময় গণভবন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সেখানে বসবাস করতেন না। তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে, যেটি পরবর্তীতে ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর’ করা হয়েছিল।
২০০১ সালে শেখ হাসিনা তখন বলেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট থাকাকালে গণভবন অফিসের কাজে ব্যবহার করতেন। মূলত বিকেল-সন্ধ্যাকালীন অফিস হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতো। শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর এই গণভবন অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল বলে জানা যায়।
জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় ১৯৮৫ সালে গণভবন সংস্কার করে সেটিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘করতোয়া’ নামকরণ করা হয়। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানদের জন্য এই অতিথি ভবন ব্যবহার করা হতো। এই ভবনে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ঢাকা সফরের সময় অবস্থান করেছিলেন বলে জানা যায়। এরপর অতিথি ভবন ‘করতোয়া’ রাষ্ট্রীয় কাজে কিছু ব্যবহার হয়েছিল।
কিন্তু ১৯৯৬ সালে নির্বাচনে জয়লাভের পর প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা গণভবনে বসবাস শুরু করেন। তখন সেটির নামকরণ করা হয় আবারও ‘গণভবন’ নামে, ২০০১ সালে শেখ হাসিনা গণভবন ছেড়ে যাবার পর কয়েক বছর সেটি আর ব্যবহৃত হতে দেখা যায়নি। এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনা প্রথমে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উঠেছিলেন। গণভবণ সংস্কার শেষে ১৪ মাস পরে ২০১০ সালের মার্চ মাসে শেখ হাসিনা সেখানে বসবাস করা শুরু করেন। শেখ হাসিনার শাসনামলের বেশির কাজ গণভবন থেকে পরিচালিত হতো।
বিশেষ করে ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর তেঁজগাও এলাকায় অবস্থিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তিনি খুব একটা অফিস করেননি। গণভবনে বসেই তিনি সরকারি কাজ এবং দলীয় বিভিন্ন সভা করেছেন। পাঁচই অগাস্ট যখন ছাত্র-জনতা গণভবনের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে, তখন তিনি এই গণভবন থেকে রওনা দিয়ে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর দিয়ে ভারতে চলে যান।







