আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের শিরোপা কেড়ে নেয়া হয়েছে সেনেগাল থেকে। দেশটির সরকার ও ফুটবল ফেডারেশন সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। শিরোপা এখন মরক্কোর। এই ট্রফি এবং চ্যাম্পিয়ন বদলের সংকট সবকিছু ছাড়িয়ে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছে আফ্রিকার দুই দেশ মরক্কো এবং সেনেগালের মধ্যে।
খেলাধুলার গণ্ডি ছাড়িয়ে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, ঘনিষ্ঠ দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। দুদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ধর্মীয়, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সম্পর্কের উপর বেশ চাপ পড়েছে। মরক্কো এবং সেনেগাল সুফি মুসলিম নেতা তিজানিয়াহর বিধান অনুসরণ করে। সে কারণে মরক্কোর ব্যাংক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে সেনেগালের। দুদেশের মধ্যে অর্থব্যবস্থা ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ রয়েছে। পাশপাশি সাংস্কৃতিক বিনিময় করে দেশ দুটি, এর অংশ হিসেবে মরক্কান এবং সেনেগালিজ শিক্ষার্থীদের যৌথ উৎসবও করে তারা।
সাম্প্রতিক এই উত্তেজনায় সেই সম্পর্ক চ্যালেঞ্জের মুখে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে মরক্কোতে ১৮ জন সেনেগালিজ সমর্থকের কারাদণ্ডের ঘটনায়। ফাইনালের পর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে সর্বোচ্চ একবছর পর্যন্ত সাজা পেয়েছেন এই সমর্থকরা। দেশটির সমর্থক গোষ্ঠীর সভাপতি সেইদিনা ইসা লায়ে দিওপ বলেছেন, ‘এই ঘটনায় দুই দেশের বন্ধুত্ব এখনও নষ্ট না হলেও, একটা সীমা আছে, এভাবে চলতে থাকলে তা সেনেগালিজদের আত্মসম্মানে আঘাত করতে পারে।’
সেনেগালের কিছু মানুষের মতে, ক্ষতি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। রাজধানী ডাকারের একজন শিক্ষার্থী বলেছেন, ‘সবকিছু ঠিক থাকলে তারা আমাদের ভাই বলে, কিন্তু যখন তাদের পক্ষে যায় না, তখন তারা খারাপ আচরণ শুরু করে।’
এই কূটনৈতিক উত্তেজনা সাধারণ মানুষের মনোভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। শুধু সেনেগাল না, মরক্কোবাসীরও সেনেগালিজদের উপর মনোভাব বদলাচ্ছে। মরক্কোর ক্ল্যাসাব্লাঙ্কায় কিছু নাগরিক জানাচ্ছেন, সেনেগালিজদের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। একজন ব্যবসায়ী বলেছেন, ‘আগে আমরা সহানুভূতি দেখাতাম, কারণ তারা সংগ্রাম করে এখানে এসেছে। কিন্তু এখন সেই সহানুভূতির জায়গায় অন্যকিছু এসেছে। এখন আমি তাদের মতো করেই আচরণ করব।’
সবকিছুর জেরে উত্তেজনার মধ্যে ডাকারে মরক্কোর দূতাবাস সংযমের আহ্বান জানিয়েছে, ‘এটি কেবল একটি খেলা এবং নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানাচ্ছি।’
সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আগেই সেনেগাল ফুটবল ফেডারেশন বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘এটি অন্যায্য, নজিরবিহীন এবং অগ্রহণযোগ্য। সেনেগালের ফুটবলের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্য আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কোর্ট অব আর্বিট্রেশন ফর স্পোর্টস-এ আপিল করবো।’
সেনেগাল সরকার বলেছে, ‘এই অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত গুরুতর সিদ্ধান্তটি বিধিমালার সুস্পষ্ট ভ্রান্ত ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে নেয়া হয়েছে, যার ফলে একটি চরম বেআইনি ও অন্যায্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। শিরোপা কেড়ে নেয়ার এই অযৌক্তিক প্রচেষ্টাকে সেনেগাল প্রত্যাখ্যান করছে।’
সবকিছু শুরু হয় জানুয়ারিতে, মরক্কোতে হয়েছিল আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনাল। বিতর্ক, উত্তেজনা আর নানা নাটকীয়তার ফাইনালে ১-০ গোলে স্বাগতিক মরক্কোকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল সেনেগাল। প্রায় দুমাস পর ফাইনালের ফলাফল পাল্টে গেছে। মার্চের ১৭ তারিখ আপিল বিচারকরা আশ্চর্যজনকভাবে মরক্কোকে আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসের নতুন চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন জানিয়েছে, তাদের আপিল বোর্ড রায় দিয়েছে যে সেনেগাল ফাইনাল থেকে ‘ওয়াকওভার দিয়েছে’ এবং অতিরিক্ত সময়ে তাদের ১-০ গোলের জয়টি আয়োজক দেশ মরক্কোর জন্য ৩-০ গোলের ওয়াকওভার জয় হিসেবে গণ্য হবে।








