সৌদি আরব দাবি করেছে, তাদের ভূখণ্ডে প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল সম্পদ সৌদি আরবকে বৈশ্বিক বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রতিযোগিতায় একটি নতুন ও প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত করতে পারে।
শুক্রবার ২৩ জানুয়ারি সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। এতে আরও বলা হয়, এমন এক সময়ে খনিজ সম্পদ আবারও আলোচনায় এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে সম্ভাব্য এক চুক্তির কথা জানিয়েছেন, যেখানে বিরল পৃথিবীর খনিজ সম্পদের অধিকার অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থ পরিষ্কার জ্বালানি রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত সামরিক প্রযুক্তি এবং উচ্চগতির কম্পিউটিংসহ নানা আধুনিক শিল্পের জন্য অপরিহার্য। বর্তমানে এই খাতে চীনের একচেটিয়া প্রভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) তথ্যমতে, বিশ্বে পরিশোধিত বিরল পৃথিবীর উৎপাদনের ৯০ শতাংশের বেশি এবং খনি উৎপাদনের ৬০ শতাংশের বেশি চীনের নিয়ন্ত্রণে।
রিয়াদে অনুষ্ঠিত ফিউচার মিনারেলস ফোরাম-এ সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেে এসএএফই (সেকিউরিটি আমিরিকাস ফিউচার এনার্জি )–এর খনিজ সম্পদ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক অ্যাবিগেল হান্টার বলেন, কয়েক দশকের কৌশলগত বিনিয়োগ, রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে চীন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে আলোকবর্ষ এগিয়ে গেছে।
তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌদি আরব এখন খনিজ খাতকে কৌশলগতভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। দেশটির দাবি অনুযায়ী, তাদের খনিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে সোনা, দস্তা, তামা, লিথিয়ামের পাশাপাশি ডিসপ্রোসিয়াম, টারবিয়াম, নিওডিমিয়াম ও প্রাসিওডিমিয়াম—যেগুলো বৈদ্যুতিক যান, বায়ু টারবাইন এবং উন্নত প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত হয়।
এনঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সৌদি আরবের খনিজ অনুসন্ধান বাজেট ৫৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে খনি লাইসেন্স দেওয়ার গতি বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুসন্ধান ও বাস্তব উৎপাদনের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। অ্যাবিগেল হান্টারের ভাষায়, একটি খনি প্রকল্প বাস্তবায়নে বহু বছর লাগে। একটি প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র গড়তে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সময় লাগে প্রায় তিন দশক।
এই বাধা কাটাতে সৌদি সরকার বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে। কর হ্রাস, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং বড় অঙ্কের সরকারি ব্যয় তার অংশ।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন খনি কোম্পানি মাদেন জানিয়েছে, আগামী এক দশকে তারা ধাতু ও খনিখাতে ১১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও বব উইল্ট বলেন, আমরা জানি, একা এই কাজ সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব অপরিহার্য।
সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনায় খনিজ খাতকে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। লক্ষ্য শুধু খনিজ উত্তোলন নয়, বরং পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলা। যার মধ্যে বৈদ্যুতিক যানবাহন উৎপাদনের মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্পও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরব ভবিষ্যতে আফ্রিকা ও গ্লোবাল সাউথ থেকে উত্তোলিত খনিজের আঞ্চলিক পরিশোধন কেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারে।
চীনের সাম্প্রতিক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার পর যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে। গত নভেম্বরে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়, যার একটি অংশ খনিজ খাতে সহযোগিতা।
মার্কিন কোম্পানি এমপি ম্যাটেরিয়ালস সৌদি আরবে একটি বিরল খনিজ শোধনাগার নির্মাণে মাদেন ও মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ঘোষণা দিয়েছে।
তবে পরিবেশগত দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের পরিবেশ অধিবেশনে খনির পরিবেশগত ক্ষতি কমানো ও সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল সৌদি আরব।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আফ্রিকার খনিজ-সমৃদ্ধ দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক জটিলতা সৌদি উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।








