আমার সময়ে যারা বাংলা কবিতায় কবি হিসেবে, কর্মী হিসেবে, প্রকৃত বাঙালি হিসেবে, প্রমিত বাঙালি হিসেবে, প্রকৃত মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠেছেন, তাদের মধ্যে অবশ্যই রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ উল্লেখযোগ্য। রুদ্র প্রথম থেকেই প্রতিবাদী ছিল। প্রথম থেকেই কবিতার জন্য একেবারেই দিওয়ানা ছিল এবং একইসঙ্গে আবার নিরীক্ষাপ্রবণ ছিল।
রুদ্র ‘ন’,‘ণ’ মানতেন না। দাঁড়ি, কমা, যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা তার একটা পদ্ধতি ছিল। অর্থ্যাৎ প্রত্যেক নতুন কবি, মৌলিক কবি, মৌলিক লেখক যেমন নিজের একটা শৈলী, নিজের একটা আঙ্গিক তৈরি করে, আগাগোড়ায় সে ছিল তেমন। আর ছিল বাঙালিত্বের প্রতি তার অসম্ভব সম্পর্ক। তিনি মনে করতেন —আমি বাঙালি একইসঙ্গে আমি মানুষ একইসঙ্গে আমি সর্বমানবের। ফলে আমাদের বাংলাদেশের যে জাতিসত্তা, মহান স্বাধীনতা সেই প্রশ্নে ছিলেন একেবারেই আপোষহীন। শব্দ দিয়ে যুক্তি দিয়ে যারা যুদ্ধ করেছে, তাদের একজন আমাদের রুদ্র। আমি বলব—কবিযোদ্ধা, কবিসৈনিক, শব্দসৈনিক।
অভিনব মনে হতে পারে কিন্তু আমি তাই মনে করি, প্রতিবাদের নান্দনিক কাব্যভাষা নির্মাণে সকল কালের বাঙালি কবিদের শীর্ষস্থানীয় যারা আছেন রুদ্র তাদের অন্যতম। একটি বড় ধরনের মূল্যায়ণ আমার তার সম্পর্কে।
খুব অভিমানী ছিল রুদ্র। ‘অভিমানের খেয়া’ নামে তার একটি বিখ্যাত কবিতাও আছে। সারাজীবন অভিমান, বিদ্রোহ, সমাজকে না মানা, না মানা বলতে সমাজকে ভেঙে ফেলা নয়, ভেঙে ফেলে নতুনভাবে গড়া। সাম্যবাদ ছিল তার সাধনা। সমতার দর্শন ছিল এবং সারা পৃথিবী মানুষের মধ্যে এক ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠুক এটা ও চাইতো। জাতিসত্তার প্রতি তার জীবন যেমন আসক্তি ছিল, তেমনি ব্যক্তিসত্তায় তার বিশ্বাস ছিল একইসঙ্গে বিশ্বব্যাপী যে মঙ্গল সত্তা, মানুষে মানুষে যে সাম্যবাদী সম্পর্ক এবং মঙ্গলময়তা তার জন্য তার বিদ্রোহ ছিল। কাজেই তাকে আমরা স্মরণ করছি।
আর বাংলাদেশকে শুরু থেকেই মনে করতো প্রাকৃতিকভাবে উপদ্রুত। ‘উপদ্রুত উপকূল’ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। মুক্তিযুদ্ধের পরই এ দেশটি বে-দখল হয়ে গিয়েছিল। ফলে ‘জাতির পতাকা আজ খামছে ধরেছে সেই পুরনো শকুন’ এটি কিন্তু সময়ের হুবুহু প্রতিধ্বনি। অকুতোভয়, নন্দনপ্রিয় এই মানবিক মানুষটি আমাদের সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ কবিতে পরিণত হয়েছে। বাংলা কবিতায়, বাংলা সাহিত্যে এবং বাংলার সৃষ্টিশীলনতায় তাকে আমরা চিরদিন আলোকপ্রিয় করে রাখব।
রুদ্র এখনও কেন এত আলোচিত
মূল ব্যাপার হচ্ছে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তিরিশের কাব্যভাষা অনুসরন করে কবি। আবার একইসঙ্গে বিশের দশকের মাঝামাঝির পর নজরুল-সুকান্ত-সুভাষ মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে যারা জাগরনের কবি, সমাজসচেতন কবি এবং তাদের যে সহজতা ছিল, লোকপ্রিয়তা ছিল রুদ্র এই দু’টি জিনিসকে একসঙ্গে ধারণ করেছেন। ফলে তার ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ আমাদের সময়ের একটি ভাষ্য। মুক্তিযুদ্ধের একটি ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের ভাষ্য এবং তারপর কোথায় আমাদের যেতে হবে সেই ভাষ্য। ফলে এখনও পর্যন্ত মুক্তিকামী নান্দনিক মানুষ যখন নিজের ভবিষ্যতের কথা দেখে, তখন সেই চরণগুলোকে দেখে, যেই চরণগুলো এখনও আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। যেমন সুকান্তের কবিতায় আমরা পাই সমাজকে কীভাবে পাল্টাতে হবে, পৃথিবীকে কীভাবে নতুন শিশুর বাসযোগ্য করতে হবে। একইভাবে আমি বলব, সময়ের যে মেসেজটা সেটি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’র কবিতায় আছে এবং বেশ স্পষ্টভাবে আছে। ফলে যারা নতুন সময় চাইবে, ভালো সময় চাইবে, মানবিক সময় চাইবে, তারা তার কবিতার কাছে যাবেই, এটা তো স্বাভাবিক।
রুদ্রর সঙ্গে স্মৃতি
সত্তরের দশকে আমি যখন বাংলা একাডেমিতে সহপরিচালক হিসেবে চাকরি করি তখন তরুণ কবি যারা ছিল আমাদের কাছে, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরীর কাছে আসতো। একদিন রুদ্র আমার কাছে আসে। এসে বলে যে, আমি কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ। বললাম, রুদ্র কেন? সে বলল, আমি বিদ্রোহী নয়, আমি রুদ্র, সবসময় ভয়াবহ। আবার প্রেমিক। আমি বললাম বাহ, সব কথাই তো তুমি বলছো। সে বললো , আমি নতুন ধরনের কবিতা লিখব। বললাম, পারলেই ভালো। বললেই তো হবে না, লিখতে হবে। সুন্দর করে একটা কবিতা আবৃত্তি করলো রুদ্র। আমি বললাম, বাহ, মনে হচ্ছে তুমি নতুন ধরনের কবিতা লিখতে পারবে। সে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ছাত্রত্ব পেরিয়ে হল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোথায় যাবে? আমাকে এসে বলল যে, আমার থাকার জায়গা নেই। আমি হল থেকে বেরিয়ে আসছি। আজকে রাত আমি কোথায় থাকব জানি না। বললাম, ঠিক আছে তুমি আমার বাসায় এসো। আমার বাসায় একটা রুম খালি পড়ে আছে। সে বলল, তাহলে আমি মাসিক ভিত্তিতে থাকব। আমি বললাম, দৈনিক ভিত্তিতে হোক মাসিক ভিত্তিতে হোক থেকো। সে বললো আমি আপনাকে টাকা দিব। বললাম, ঠিক আছে। জানতে চাইলাম কত দিবা? পরে আমি বললাম যত পারো তত দিবা। এইভাবে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক। এভাবে রুদ্র বহুদিন প্রায় দেড় বছর আমার সঙ্গেই ছিল। যখন মাস শেষ হলো সে বলল, ভাড়াটা কতো আমি তো ঠিক করলাম না। আমি বললাম, পরে ঠিক করো। ভাড়া আর ঠিক করতে হয়নি। এভাবেই চলছিল। তার যে প্রথম স্ত্রী তসলিমা নাসরিন সেও আমার মেয়ের মতো। সারাজীবনই আমরা রাখাল-দ্রাবিড় একই কাজ করেছি।
আমি শুধু বলতে চাই তার শিল্প-সাহিত্য ওই সময় যতদিন ছিল রুদ্র খুব পাশাপাশি ছিলাম। ধরা যাক আমি দীর্ঘ কবিতা লিখছি, সে বলত আমিও লিখব। সেও লিখতে শুরু করছে ‘মানুষের মানচিত্র।’ ফলে সহযোগিতা-প্রতিযোগিতা সবই ছিল, যেটা থাকে। এক ধরনের ঈর্ষা ছিল, এক ধরনের শ্রদ্ধা ছিল যেহেতু আমি বড় ছিলাম। এক ধরনের স্নেহ ছিল তার প্রতি। এক ধরনের ভালো বোধ ছিল আমার প্রতি, অন্যরা যেটাকে শ্রদ্ধা বলে।
মুহম্মদ নূরুল হুদা:কবি ও মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি







