বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের অন্যতম পরিচিত নাম রোমেনা আফাজের জন্মশতবর্ষ পূর্ণ হচ্ছে ২০২৬ সালে। ১৯২৬ সালে জন্ম নেওয়া এই লেখক ২০০৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। শতবর্ষের এই মুহূর্তে তাঁর সাহিত্যকর্ম, বিশেষ করে দস্যু বনহর সিরিজকে ঘিরে পাঠকমহলে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
রোমেনা আফাজ বাংলা সাহিত্যে এমন এক নায়কের জন্ম দিয়েছিলেন, যিনি প্রচলিত অর্থে নায়ক নন। সমাজ ও আইনের বাইরে অবস্থান করেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দস্যু বনহর দ্রুতই পাঠকদের কল্পনায় জায়গা করে নেয়। ষাটের দশক থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় ধরে বনহরের গল্প বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাঠককে আকৃষ্ট করে রাখে।
সাহিত্য বিশ্লেষকদের মতে, বনহর ছিল এমন এক চরিত্র, যে সমাজের ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কাজ করত। কালো পোশাকে আবৃত রহস্যময় এই দস্যু একদিকে যেমন আইনভঙ্গকারী, অন্যদিকে তেমনি অন্যায়ের প্রতিকারক। এই দ্বৈত চরিত্রই তাকে সাধারণ নায়কদের থেকে আলাদা করেছে।
রোমেনা আফাজের লেখালেখির সময়টিতে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা উপন্যাসে বাস্তববাদী ও সংকটময় চরিত্রের প্রাধান্য ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে বনহরের মতো দুর্ধর্ষ ও রোমাঞ্চকর নায়কের আবির্ভাব পাঠকদের কাছে ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে নারী পাঠকদের মধ্যে বনহর ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বহু কিশোরী ও তরুণীর কল্পনায় স্বপ্নপুরুষের প্রতীক হয়ে ওঠে।
সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, রোমেনা আফাজের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল গল্প বলার ক্ষমতা। তিনি পাঠককে ধরে রাখতে পারতেন অসাধারণ দক্ষতায়। তবে তাঁর গদ্যভাষা, বাক্যগঠন ও ভাষাশৈলী নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। অনেকের মতে, জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও তিনি সাহিত্যিক কারিগরি দক্ষতার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেননি।
রোমেনা আফাজের ব্যক্তিজীবনও ছিল সংগ্রামময়। অল্প বয়সে বিয়ে, অল্প বয়সেই মাতৃত্ব এবং বিশাল সংসারের দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে তিনি লেখালেখি চালিয়ে গেছেন। নিরিবিলি পরিবেশ বা লেখার আলাদা সুযোগ না পেয়েও শতাধিক বই রচনা করেছেন তিনি। পারিবারিক ব্যস্ততার মধ্যেই সময় বের করে লিখেছেন তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাসগুলো।
সাহিত্য গবেষকদের মতে, তাঁর সীমাবদ্ধতা যেমন ছিল, তেমনি ছিল অদম্য অধ্যবসায় ও পাঠককে মুগ্ধ করার বিরল ক্ষমতা। বনহর সিরিজের মাধ্যমে তিনি বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছেন, যা এখনও পাঠকদের স্মৃতিতে জীবন্ত।
জন্মশতবর্ষে তাই রোমেনা আফাজকে শুধু একজন জনপ্রিয় লেখক হিসেবেই নয়, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও সৃজনশীলতার অনন্য উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করা হচ্ছে। তাঁর সৃষ্ট দস্যু বনহর এবং গল্প বলার জাদু বাংলা সাহিত্যের পাঠকসমাজে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত থাকবে।









