ভারতের সংসদ ভবনের প্রধান ফটক মকর দ্বারের বাইরে অমিত শাহ, রাহুল গান্ধী ও অযোধ্যার রাম মন্দির ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ করেছেন ক্ষমতাসীন এনডিএ ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত স্লোগান চলার সময় তাদের মাঝখানে নিরাপত্তাকর্মীদের একটি সারি অবস্থান নেয়।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
বিরোধীদের প্রধান দুটি দাবি হলো, দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের দমন-পীড়ন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে সংসদে এসে ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং অযোধ্যার রাম মন্দিরের অনুদানের অর্থে কথিত অনিয়ম নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
এর জবাবে পাল্টা বিক্ষোভে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে আলোচনায় অংশ না নেওয়া এবং দ্বৈত নীতি অনুসরণের অভিযোগ তোলেন। তাদের দাবি, কংগ্রেস ঝাড়খণ্ডের ক্ষমতাসীন হেমন্ত সোরেন সরকারের জোটসঙ্গী হলেও সেখানে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে।
সরকার অমিত শাহকে সংসদে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার এক দিন পর এই পাল্টা বিক্ষোভ হলো।
সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানিয়েছিলেন, সংসদের কার্যক্রমে বিঘ্ন না ঘটলে অমিত শাহ বিরোধীদের প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত।
এর জবাবে লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, তারা অমিত শাহের ‘মতামত’ শুনতে আগ্রহী নন। শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের দমন-পীড়নের নির্দেশের পেছনে কারা ছিল, সেটির সরাসরি জবাব চান তারা।
এদিকে ধারাবাহিক হট্টগোল ও একাধিক অকার্যকর কর্মদিবসের কারণে লোকসভার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
বর্ষাকালীন অধিবেশনের শেষ সপ্তাহে স্পিকার ওম বিড়লা বলেন, সরকার জানিয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জবাব দিতে প্রস্তুত। সরকার আপনাদের প্রধান দাবি মেনে নিয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় নিয়েও আলোচনা হবে। দয়া করে সহযোগিতা করুন।
এ সময় বিজেপি সংসদ সদস্য মুকেশ দালাল কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে ‘শরম করো, শরম করো’ স্লোগান দিতে থাকেন। ঠিক তখনই সংসদে প্রবেশ করেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ওই বিজেপি সংসদ সদস্যের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হাসতে হাসতে বলেন, ‘রাহুল গান্ধী ইতোমধ্যে ঝাড়খণ্ডে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করেছেন।’
জবাবে ক্ষুব্ধ বিজেপি সংসদ সদস্য বলেন, ঝাড়খণ্ডে যান। আপনি ঝাড়খণ্ডে কেন যাননি? এরপর প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বিরোধী সংসদ সদস্যদের বিক্ষোভে যোগ দেন।
সাংবাদিকদের প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, বিরোধীদের চাপের কারণেই সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা বিক্ষোভে নেমেছেন।
তিনি বলেন, ‘প্রথমবারের মতো আমরা সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের বিক্ষোভ করতে দেখছি। আমরা তাদের এই পর্যায়ে আসতে বাধ্য করেছি। এখন তারা সামনে এসে বক্তব্য দিক।’
ঝাড়খণ্ডে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ
ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে জেপিএসসি ও জেএসএসসি-র পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে বিধানসভা ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিচার্জ ও জলকামান ব্যবহার করে।
বিক্ষোভকারীদের ব্যানারে লেখা ছিল, ঝাড়খণ্ডে ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জের জবাব রাহুল গান্ধীকে দিতে হবে।
বিজেপি সংসদ সদস্য অনুরাগ ঠাকুর এ ঘটনায় রাহুল গান্ধীর সমালোচনা করে বলেন, ঝাড়খণ্ডের বিক্ষোভরত তরুণদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘ঝাড়খণ্ডের তরুণদের ন্যায়বিচার দিতে হবে। তাদের ওপর যেভাবে লাঠিচার্জ ও নির্যাতন করা হয়েছে, তাতে রাহুল গান্ধীর মানসিকতারই প্রকাশ ঘটেছে।’
অনুরাগ ঠাকুর আরও অভিযোগ করেন, রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস সংসদে উপস্থিত না থেকেও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জবাব চাইছেন।
তার ভাষ্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জবাব দিতে প্রস্তুত। কিন্তু রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস দল শিরোনামে থাকার জন্য মিথ্যা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য দিচ্ছে।
অন্যদিকে কংগ্রেস সংসদ সদস্য মানিকম ঠাকুর নিখোঁজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে লোকসভায় হাজির হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের অভিযানের দায় এড়াতে অমিত শাহ সংসদের কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন না।
ঠাকুরের দাবি, অমিত শাহ সংসদ ভবন চত্বরে উপস্থিত থাকলেও ইচ্ছাকৃতভাবে অধিবেশনের কার্যক্রম এড়িয়ে যাচ্ছেন।
ঝাড়খণ্ডের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে রাহুল গান্ধীকে যুক্ত করার বিজেপির প্রচেষ্টারও সমালোচনা করেন তিনি। তার বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট এলাকায় সাংবিধানিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাই সেখানকার ঘটনার জন্য দায়ী।
তিনি বলেন, ঝাড়খণ্ডে যা ঘটেছে তার জন্য ঝাড়খণ্ড সরকার দায়ী। রাহুল গান্ধী সেখানে মুখ্যমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নন। দিল্লিতে যা ঘটে তার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দায়ী, কারণ দিল্লি পুলিশ তার অধীনে।
শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগের সমালোচনা রাহুলের
সোমবার ঝাড়খণ্ডে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের বলপ্রয়োগের সমালোচনা করেন রাহুল গান্ধী। এতে জোটসঙ্গী ঝাড়খণ্ড সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা সমালোচনার মধ্যেও তিনি শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নেন।
রাহুল গান্ধী বলেন, ঝাড়খণ্ডে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ওপর বলপ্রয়োগ ভুল। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। আর কেবল সংলাপের মাধ্যমেই সমাধান পাওয়া সম্ভব। ঝাড়খণ্ড সরকারকে শিক্ষার্থীদের কথা শুনে তাদের সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে হবে।
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও সরকারের বিরুদ্ধে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন। ঝাড়খণ্ডের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ হলো সংলাপ।
অখিলেশ যাদব বলেন, শিক্ষা, পরীক্ষা ও রাম মন্দিরের বিষয়গুলো পরস্পর সম্পর্কিত এবং এসব বিষয়ে একই জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত আসছে বলে তিনি মনে করেন। তাই সব বিষয় নিয়েই সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, আজ যা বলা হচ্ছে, তা এক সপ্তাহ আগেও বলা যেত। তখন কেন বলা হয়নি? কারণ তারা আসলে আলোচনা করতে চায় না। আলোচনার পাশাপাশি তারা ভগবান রামের নামও উচ্চারণ করতে চায় না।
ঝাড়খণ্ডের প্রসঙ্গে অখিলেশ বলেন, আমি আগেও বলেছি এবং এখনো বলছি, সংলাপই এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। নিয়মিত আলোচনা প্রয়োজন। মুখ্যমন্ত্রী ও সরকার ইতোমধ্যেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।








