রিজার্ভ চুরি: অর্থ ফেরাতে নতুন উদ্যোগ, ফিলিপাইনের জবাবের অপেক্ষা
ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্ত

সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত আইজিপি ও সিআইডি প্রধান মো. ছিবগাত উল্ল্যাহ
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজাভ চুরির ঘটনায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে ফিলিপাইনের একটি ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ৮১ মিলিয়ন ডলার রয়েছে। সেই ৮১ মিলিয়ন ডলার বাজেয়াপ্ত করতে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত আদেশ দিয়েছেন। সেই আদেশ ফিলিপাইনের যথাযথ কর্তৃপক্ষকে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ।
সিআইডি ও বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের আশা ফিলিপাইন এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিবে এবং দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা ফিরিয়ে দিবে। এর আগে রিজার্ভ চুরির ৬৮ হাজার ডলার বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল ফিলিপাইন।
রোববার বিকেলে রাজধানীর মালিবাগে অবস্থিত সিআইডির হেডকোয়ার্টারে অতিরিক্ত আইজিপি ও সিআইডি প্রধান মো. ছিবগাত উল্ল্যাহ এসব কথা বলেন।
মো. ছিবগাত উল্ল্যাহ বলেন, প্রায় নয় বছর আগে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে সাইবার জালিয়াতির মাধ্যমে চুরি হওয়া ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছে ঢাকার জেষ্ঠ্য বিশেষ জজ আদালত। ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি) ৮১ মিলিয়ন ডলার পাচারে জড়িত ছিল। সিআইডির আবেদনের প্রেক্ষিতে এবং প্রাপ্ত তথ্য ও আলামত, ফিলিপাইন সরকারের সরবরাহ করা পারস্পরিক আইনি সহায়তা অনুরোধের মাধ্যমে সংগৃহীত সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের বিশেষ আদালত মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় আরসিবিসি থেকে ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে, আরসিবিসি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও সিইও লরেঞ্জো ট্যান, জুপিটার ব্রাঞ্চের ম্যানেজার মাইয়া সান্তোস ডিগুইতো এবং ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও জুপিটার ব্রাঞ্চের আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ৫টি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলার মাধ্যমে চুরি হওয়া অর্থ পাচারে সরাসরি জড়িত ছিলেন। ফিলিপাইনের আদালত ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দোষী সাব্যস্ত করেছে এবং দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরসিবিসি এর ওপর বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করেছে। ২০১৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি আরসিবিসি মাত্র ৬৮ হাজার মার্কিন ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকে ফেরত দিয়েছিল, যা তাদের পক্ষ থেকে অর্থ ফেরতের প্রথম পদক্ষেপ ছিল। তদন্তে আরও প্রমাণিত হয়েছে যে, এই ঘটনাটি কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং বাংলাদেশের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ধারা ২৭ অনুযায়ী আরসিবিসি কর্পোরেট সত্তা হিসেবে সম্পূর্ণভাবে মানিলন্ডারিং অপরাধে জড়িত ছিল।
তিনি আরও বলেন, আদালত নির্দেশ দেন যে, আরসিবিসি থেকে বাজেয়াপ্ত হওয়া পুরো ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে ফেরত পাঠাতে হবে। এ আদেশ বাস্তবায়নের জন্য কপি বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। জাতিসংঘের ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম, ফিলিপাইনের আইন এবং ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ) নির্দেশনার আলোকে বাংলাদেশ সরকার এখন ফিলিপাইন সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা করবে, যাতে বাজেয়াপ্তির আদেশ কার্যকর হয় এবং পাচার হওয়া অর্থ পুরোপুরি ফেরত আসে।
সিআইডি প্রধান বলেন, আমরা আশা করি দ্রুত সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করে সঠিক চ্যানেলের মাধ্যমে ৮১ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে পারব। এই রিজার্ভ চুরির সঙ্গে দেশি-বিদেশি যারা জড়িত তাদের সকলের বিরুদ্ধে আমাদের তদন্ত চলমান আছে। আমার দ্রুত এই মামলার চার্জশিট দিয়ে দিব।
এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ বলেন, এর আগে ৬৮ হাজার মার্কিন ডলার ফিলিপাইন থেকে ফেরত এসেছিল। পাঁচ জনের নামে যেই ভুয়া একাউন্ট ছিল তার মাধ্যমে করেছে এটা প্রমাণিত হয়। ফিলিপাইন সেটা বুঝতে পেরেই ৬৮ হাজার মার্কিন ডলার ফেরত দেয়। এতে প্রমানিত হয়, সেখানে টাকা পাচারের ঘটনা ঘটেছে। এতে এটাও প্রমাণ হয়েছে এটা বাংলাদেশের টাকা।
এদিকে রিজার্ভ চুরির টাকা শ্রীলঙ্কাতেও চলে গিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার কর্তৃপক্ষ যখন বুঝতে পরেছিল এটা মানি লন্ডারিংয়ের টাকা তখন তারা বাংলাদেশকে টাকা ফিরিয়ে দেয় বলেও জানা তিনি।
রিজার্ভ চুরির সঙ্গে শেখ হাসিনার পরিবারের কারোর সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ বলেন, আমরা তদন্তের শেষ পর্যায়ে আছি। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে দেশি বিদেশি যারাই জড়িত থাকবে তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসবো৷ আমরা তদন্তের শেষ পর্যায়ে আছি। তদন্ত শেষ হলে আমরা দ্রুত চার্জশিট জমা দেবো আদালতে। এই ঘটনায় জড়িত দেশি-বিদেশি কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা গুরুত্বসহকারে এ তদন্ত করছি তদন্ত শেষ পর্যায়ে আছে।
সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পেশাল প্রসিকিউটর এডভাইজার অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী বলেন, সিআইডির আবেদনের প্রেক্ষিতে বিশেষ আদালত ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকে পাচার করা ৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেয়াপ্তের জন্য একটি আদেশ দিয়েছে। এ আদেশের অনুলিপি ফিলিপাইনের সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাদেরকে এই কারণে পাঠানো হয়েছে যাতে আদেশটাকে কার্যকর করার জন্য প্রশাসনিকভাবে দ্রুততার সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়। এটি পুরোপুরি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে এই টাকা দেশে ফিরে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
দীর্ঘদিনেও মামলার তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় গত ১২ মার্চ আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে প্রধান করে একটি উচ্চ পর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটির প্রধান আসিফ নজরুল বলেছিলেন, “হ্যাকারদের মূল পরিকল্পনা ছিল ২ বিলিয়ন ডলার চুরি করা। সেটা হলে দেশ আজ দুর্ভিক্ষের মধ্যে পড়তো। এই চুরির সঙ্গে দেশের ভেতরের চক্র জড়িত ছিল।”
আসিফ নজরুল জানান, সিআইডির তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরসহ ১৩ জন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। সিআইডির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
রিজার্ভের অর্থ উদ্ধারে বিদেশি আইনি ফার্ম নিয়োগেও অনিয়মের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আসিফ নজরুল। তিনি বলেছিলেন, “তৎকালীন সরকার কিছু লিগ্যাল ফার্মকে রিজার্ভ উদ্ধারের কাজ দিয়েছিল। ওই ফার্মের সঙ্গে গত সরকারের ঘনিষ্ঠ একজন আইনজীবী জড়িত ছিলেন। এই ফার্মকে লাখ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে ইমেইল আদানপ্রদান করলেও টাকা দিতে হতো।”
রিজার্ভের অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৯ সালে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন সাদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে আরসিবিসির বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছিল। কিন্তু ২০২২ সালের এপ্রিলে এখতিয়ারের কারণ দেখিয়ে আদালত মামলাটি খারিজ করে দেয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক এখতিয়ারভুক্ত অন্য আদালতে মামলা করে।







