বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এক জটিল বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত, ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ঝুঁকির মুখে নবায়নযোগ্য জ্বালানি আর শুধু ‘পরিবেশবান্ধব’ বিকল্প নয়- এখন এটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অপরিহার্যতায় পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩০,৭৩৮ মেগাওয়াট হলেও নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে মাত্র ১,৫৬২ মেগাওয়াট- যা মোট উৎপাদনের পাঁচ শতাংশেরও কম। বৈশ্বিক গড় যেখানে ৩০ শতাংশের বেশি, সেখানে বাংলাদেশ এই খাতে অনেক পিছিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গতি অব্যাহত থাকলে টেকসই জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হয়ে যাবে।
২০২৩ সালের খসড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসবে বলে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে এই হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ২০২৪ সাল পর্যন্ত গড়ে বছরে ১০০ মেগাওয়াটেরও কম নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। লক্ষ্য পূরণে আগামী বছরগুলোতে প্রতি বছর অন্তত ৭০০–৮০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সংযোজন প্রয়োজন- যা বর্তমান হারের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।
মূল চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে: জমির স্বল্পতা, প্রকল্প অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির অভাব। বিশেষ করে নির্দিষ্ট ফিড–ইন–টারিফ (সরকার নির্ধারিত বিদ্যুৎ ক্রয়মূল্য) না থাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে সাহস পান না। এছাড়াও, নীতিমালায় অস্পষ্টতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যেতে হবে। কেউ চাপিয়ে দিবে তা নিয়ে এগোনো ঠিক হবে না। গত ১৫ বছরে আমরা শুধু মেগা প্রজেক্টের পেছনে ঘুরেছি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে সেভাবে টেকসই কোনও কাজের অগ্রগতি হয়নি। ঐতিহাসিকভাবে আমরা গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের জন্য একেবারে দায়ী নই। পরিবেশ রক্ষায় আমাদের টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের জ্বালানি নীতিগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। টেকসই জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিতে জ্বালানি নিয়ে মহাপরিকল্পনা করার সময় এসেছে। পাশাপাশি আমাদের দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিবেচনায় এনে ‘বটম-আপ অ্যাপ্রোচে’ যেতে হবে।
তবে আশার আলোও রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ১.৩ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও কেএফডব্লিউ–এর মতো উন্নয়ন সহযোগীরাও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই তহবিল ও সহায়তা কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশকে প্রয়োজন বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা, স্বচ্ছ প্রকল্প কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরিবেশগত অনুমোদন প্রক্রিয়া।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেবল একটি “বিকল্প উৎস” হিসেবে না দেখে দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে হবে। দেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য সৌর ও বায়ু শক্তির বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যা সঠিক নীতিমালা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব।
টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়তে এখন দরকার স্পষ্ট লক্ষ্য, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সকলে মিলে কাজ করার মানসিকতা। নয়তো সম্ভাবনার এই জানালা আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে- যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।








