বাংলাদেশের সরকারি সেবা প্রাপ্তি সাধারণ জনগণের জন্য প্রায়শই জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। সরকারি দপ্তরগুলোতে সেবার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঝামেলা, এবং প্রায়শই দুর্নীতির মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেবা প্রাপ্তির এই সমস্যাগুলো জনগণের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে এবং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমায়।
সরকারি সেবা সহজলভ্য করা হলে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং প্রশাসনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পাবে। জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং প্রশাসনের ওপর আস্থা বৃদ্ধি করার জন্য সরকারি সেবা প্রদান প্রক্রিয়াকে সহজলভ্য এবং কার্যকর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেবার মান উন্নত করতে প্রশাসনিক সংস্কার দরকার, যা ই-গভর্নেন্সের উন্নয়ন থেকে শুরু করে দুর্নীতি দমন, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সম্ভব।
একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন সরকারি সেবা যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। সরকারি সেবা প্রদান এর ক্ষেত্রেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সরকার ইতোমধ্যেই বিভিন্ন সেবা অনলাইনে সরবরাহ করার চেষ্টা করছে। উদাহরণস্বরূপ, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, পাসপোর্ট, এবং কর ফাইলিং এখন অনলাইনে করা যাচ্ছে। সরকার ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার এর মাধ্যমে গ্রামীণ জনপদেও বিভিন্ন সরকারি সেবা সহজলভ্য করতে সক্ষম হয়েছে।
এত উদ্যোগ সত্ত্বেও বাংলাদেশে সরকারি সেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে বেশ কিছু জটিলতা বিদ্যমান। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে কিছু সরকারি সেবা অনলাইনে সরবরাহ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো এখনো পূর্ণাঙ্গ নয়।
দেশের অনেক অঞ্চলে মানসম্পন্ন ইন্টারনেট সংযোগের অভাব, কম্পিউটার এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব বিদ্যমান, যা সেবাগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করে। পাশাপাশি, সরকারি সেবা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং প্রক্রিয়া সাধারণত জটিল এবং অনেক ক্ষেত্রে অস্বচ্ছ। অনেক নাগরিক সঠিক তথ্যের অভাবে সেবা পেতে গিয়ে হয়রানির শিকার হন। সরকারি অফিসগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও সমস্যা সৃষ্টি করে, ফলে নাগরিকদের বারবার একাধিক অফিসে যেতে হয়।
এছাড়া, সরকারি সেবার মান নিয়ন্ত্রণে দুর্নীতি একটি বড় সমস্যা। অনেক সময় সেবাগ্রহণের জন্য জনগণকে ঘুষ দিতে হয়, যা সরকারি সেবার উপর জনগণের আস্থা নষ্ট করে। সেই সাথে, এখনও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সক্ষমতার অভাবে অনেক ক্ষেত্রে ই সেবা প্রাপ্তির জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের উপর বেশি নির্ভরশীলতা বিদ্যমান।
বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার আলোকে কার্যকর উন্নতির উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। সরকারি সেবা প্রদান প্রক্রিয়া সহজলভ্য করার জন্য ই-গভর্নেন্স অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন সরকারি সেবা অনলাইনে সরবরাহ করা হলে সেবার প্রাপ্তির জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রিতা কমানো সম্ভব।
জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা ২০১৮ এবং “একসেস টু ইনফরমেশন ( এ২আই)” কর্মসূচির আওতায় বেশ কিছু সরকারি সেবা অনলাইনে সরবরাহ করা হলেও এখনো অনেক সেবা অফলাইন ভিত্তিক, যা সাধারণ জনগণের জন্য ঝামেলাপূর্ণ।

এছাড়াও, অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহণ প্রক্রিয়া দুর্বল ইন্টারনেট কাভারেজ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। উদাহরণস্বরূপ, দেশের কিছু এলাকায় অনলাইনে আবেদন করলেও স্থানীয় অফিসে গিয়ে কাগজপত্র জমা দিতে হয়, যা পুরো ডিজিটাল সেবা প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। সরকারি সেবা আরও সহজলভ্য করতে “একক সেবা পোটাল চালু করা অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এতে বিভিন্ন সরকারি সেবা একই প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যায়, ফলে নাগরিকদের বারবার ভিন্ন ভিন্ন ওযেবসাইটে যেতে হয় না।
এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের “মাইইনফো” একটি অনন্য উদাহরণ, যেখানে নাগরিকদের একবার তাদের তথ্য প্রদান করার পর সমস্ত সরকারি সেবা এক প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যায়। এই পোর্টালে বিভিন্ন সেবা যেমন বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং কর প্রদান করা সম্ভব। বাংলাদেশেও এমন একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করা হলে নাগরিকরা একটি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সমস্ত সেবা গ্রহণ করতে পারবেন, যা সেবাপ্রাপ্তি প্রক্রিয়াকে দ্রুত এবং সুবিধাজনক করে তুলবে।
এছাড়াও, এস্তোনিয়ায় “ই-এস্তোনিয়া” নামক একটি একক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিকরা সমস্ত সেবা অনলাইনে গ্রহণ করতে পারেন। এই প্ল্যাটফর্মে নাগরিকদের একটি ডিজিটাল পরিচয় (আইডি) আছে, যা দিয়ে ভোট প্রদান থেকে শুরু করে কর পরিশোধ, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যবসা নিবন্ধন সবকিছু করা যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এমন একটি সিস্টেম চালু করা হলে জনগণের সরকারি সেবা গ্রহণ প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে সহজ হবে।
ডিজিটাল পরিচয়পত্র সিস্টেম থাকা দরকার। একটি শক্তিশালী ডিজিটাল আইডি সিস্টেম এবং বিভিন্ন তথ্যভান্ডারের সমন্বয় জনগণের জন্য সেবা গ্রহণ প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজ করে সম্ভব। এতে নাগরিকদের একবার তাদের পরিচয় প্রমাণ করলে পরে বারবার কাগজপত্র দেখানোর প্রযোজনীয়তা থাকে না, যা প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ করে।
যদিও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু সেবা যেমন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, মোবাইল সিম নিবন্ধন এবং সরকারি বিভিন্ন সহায়তা গ্রহণ করা যায়। তবে, এনআইডি এখনো সব সেবার সাথে সম্পূর্ণভাবে সংযুক্ত নয়। এক্ষেত্রে, ভারতের “আধার” সিস্টেম একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি সিস্টেম, যেখানে নাগরিকদের একটি ইউনিক আইডি নম্বর আছে যা সব ধরনের সেবার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য। আধার নম্বর ব্যবহার করে জনগণ স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি ভর্তুকি, ব্যাংকিং সুবিধা, এবং অন্যান্য সেবা নিতে পারে। বাংলাদেশেও যদি এনআইডি সিস্টেমকে আধার প্রকল্পের মতো শক্তিশালী এবং সব সেবার ক্ষেত্রে সমন্বিত করা যায়, তাহলে সেবাগ্রহণের প্রক্রিয়া অনেক সহজ হবে।
পাশাপাশি, সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং সেবার মানের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করা গেলে সেবা প্রদান আরও কার্যকর হতে পারে। জনগণের অংশগ্রহণ সরকারকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করে তুলবে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে জননিরীক্ষা (সোশ্যাল অডিট) কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে, যেখানে জনগণ প্রশাসনিক কার্যক্রমের মূল্যায়ন করতে পারে। তবে, এই উদ্যোগটি সীমিত এবং আরও প্রসারিত করা প্রয়োজন। ফিলিপাইনে “বারাগেই সোশ্যাল অডিট” ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণ প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সেবার মান সরাসরি মূল্যায়ন করতে পারে।
এটি সেবা প্রদানে স্বচ্ছতা বাড়িয়েছে এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশেও এমন একটি জননিরীক্ষা প্রক্রিয়া চালু করা হলে সেবা প্রদানের মান উন্নত হবে এবং জনগণের অংশগ্রহণ বাড়বে।
সেই সাথে, সরকারি সেবাগুলোতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। দুর্নীতি এবং অদক্ষতার কারণে সরকারি সেবা প্রায়ই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
বাংলাদেশে “ই-প্রকিউরমেন্ট” ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় কিছুটা স্বচ্ছতা আনা হয়েছে। এই ব্যবস্থা দুর্নীতি কমিয়ে এনে স্বচ্ছভাবে ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ দেয়। তবে, অন্যান্য সেবা ক্ষেত্রেও এই ধরনের স্বচ্ছতা প্রয়োজন। নিউজিল্যান্ডে “অফিসিয়াল ইনফরমেশন অ্যাক্ট” এর মাধ্যমে জনগণ সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে পারে এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে।

বাংলাদেশে যদিও “তথ্য অধিকার আইন রয়েছে এ আইনের অধিকতর কার্যকর বাস্তবায়ন করা গেলে জনগণের সেবা প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
অধিকন্তু, সরকারি সেবা প্রদানকারীদের দক্ষতা উন্নয়ন করা না হলে সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বাড়ানোর প্রযোজন রয়েছে। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে এবং সেবা প্রক্রিয়া সহজে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, যাতে তারা অনলাইন সেবা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে প্রদান করতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়া ডেভলপমেন্ট ইষ্টিটিউট (কেডিআই) এর অধীনে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করা হয়। এই প্রশিক্ষণগুলো কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়ন করে এবং সেবার গুণগত মান বৃদ্ধি করে। একই আদলে বাংলাদেশেও সরকারি কর্মচারীদের নিয়মিত প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে হবে।
সর্বোপরি, স্থানীয় সরকার ক্ষমতায়ন এবং বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় সরকার ইউনিটগুলোকে ক্ষমতায়িত করা হলে সেবাগুলো জনগণের নিকটবর্তী হয়ে আসবে। বর্তমানে কেন্দ্রীয়করণ ব্যবস্থার কারণে অনেক সেবা কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে থেকে স্থানীয় পর্যায়ে সঠিকভাবে পৌঁছায় না।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদ) আইন ২০০৯ এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ইউনিটগুলোকে ক্ষমতায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে, এখনও অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অভাব রয়েছে, যা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।
ভারতে “পঞ্চায়েত রাজ” ব্যবস্থা স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করেছে এবং জনগণের নিকটবর্তী সেবা প্রদান নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশেও যদি স্থানীয় সরকার ইউনিটগুলোকে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে আরও ক্ষমতায়িত করা হয়, তাহলে স্থানীয় স্তরে সরকারি সেবা সহজলভ্য করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের সরকারি সেবা প্রদান প্রক্রিয়া সহজলভ্য করার জন্য একটি কার্যকর এবং সমন্বিত প্রশাসনিক সংস্কার অপরিহার্য। ই-গভর্নেন্সের বিস্তার, একক সেবা পোর্টাল চালু, ডিজিটাল পরিচয়পত্র ব্যবহারের প্রসার, স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়ন, এবং জননিরীক্ষার মতো পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হলে সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া দ্রুত এবং সুবিধাজনক হবে। এ ক্ষেত্রে এস্তোনিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফিলিপাইনের উদাহরণগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







