নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ১৭২ জনের মৃত্যুর পর এই দুর্যোগের পেছনে চীনের ভূখণ্ডে কোনো ‘জিওলজিক্যাল ডিজাস্টার ড্যাম’ বা প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে চীন এ ধরনের অভিযোগকে ‘ভুয়া’ বলে দাবি করেছে।
বৃহস্পতিবার ২৭ আগস্ট আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি তথ্যে, নেপালের রসুওয়াগাধি-গিরং সীমান্ত ও গিরং বন্দর এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর দেশটির বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন ওঠে, চীনের পক্ষ থেকে আগাম সতর্কতা দেওয়া হলে সীমান্তের নিচের দিকে থাকা মানুষদের প্রাণহানি কমানো সম্ভব হতো কি না।
নেপালের সংবাদমাধ্যম নয়াপত্রিকার এক সাংবাদিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, চীনের ভূখণ্ড থেকে বারবার দুর্যোগের প্রভাব এলেও নেপাল একতরফাভাবে এর মূল্য দিচ্ছে। একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নেপালের জাতীয় পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান গোবিন্দ রাজ পোখারেল।
তিনি বলেন, চীনের উন্নত স্যাটেলাইট ও প্রযুক্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন কোনো বিপর্যয়ের পূর্বাভাস পাওয়া এবং তা নেপালকে জানানো সম্ভব ছিল বলে তিনি আশা করেছিলেন। কিন্তু তা হয়নি। এমনকি নদীর তীরে মানুষকে সতর্ক করতে যাওয়া পুলিশ সদস্যরাও পানির স্রোতে ভেসে যান।
পোখারেলের মতে, সীমান্ত এলাকায় হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা গলফ, বন্যা ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় চীন ও নেপালের মধ্যে আরও কার্যকর তথ্য বিনিময় ও আগাম সতর্কতাব্যবস্থা প্রয়োজন।
নেপালে চীনা দূতাবাস এক বিবৃতিতে চীনের ভূখণ্ডে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের বাঁধ ধসে নেপালে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, এমন দাবিকে ‘ভুয়া’ বলে অভিহিত করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট সকালে নেপালের ভূখণ্ডে ভূমিকম্প বা ভূমিকম্পের মতো একটি হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটে। এর ফলে ব্যাপক কাদাধস সৃষ্টি হয় এবং গিরং-রসুওয়াগাধি সীমান্ত এলাকায় নেপাল ও চীন উভয় পাশেই হতাহত ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটে।
চীনা দূতাবাস আরও বলেছে, অভিযোগ কোনো কাজে আসে না, সহযোগিতাই জীবন বাঁচায়।
কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সমন্বয় কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি)-এর জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বুধবারের আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত সম্ভবত একটি হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল অংশ ধসে পড়ার মাধ্যমে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) তথ্য অনুযায়ী, নেপাল-চীন সীমান্তের হিমবাহ অঞ্চলের কাছে তুষার ও পাথরের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে। এলাকাটি রসুওয়াগাধি সীমান্ত চৌকি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে।
ধসে পড়া বরফ-পাথর কোনো হিমবাহ হ্রদে পড়ে অথবা নদীর প্রবাহ আটকে দেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরপর বরফ, গলিত পানি ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের স্রোত লেন্দে খোলা নদী হয়ে ভোতে কোশি নদীতে নেমে আসে। এর ফলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়।
এর আগে ঘটনাস্থলের কাছে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) সর্বশেষ বিশ্লেষণে সেখানে ভূমিকম্পের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে ভূমিধস বা হিমবাহ ধসের প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে।
নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগও হিমবাহ হ্রদের পানি হঠাৎ বেরিয়ে আসার ঘটনা, অর্থাৎ গলফ, এই বন্যার কারণ কি না তা খতিয়ে দেখছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টেও একই অঞ্চলে হিমবাহ হ্রদের পানি উপচে আকস্মিক বন্যা হয়েছিল। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে তিব্বতের একটি হিমবাহ হ্রদ থেকে পানি বেরিয়ে ওই বন্যা সৃষ্টি হয়। এতে নয়জন নিহত এবং নেপাল-চীন সংযোগকারী একটি সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
এবারের দুর্যোগে চীনের গিরং বন্দরেও ভূমিধস হয়েছে। এতে বন্দরমুখী সড়ক, যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।









