চিকিৎসকদের শুদ্ধাচার: তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রে পেশা, পুঁজি ও মানুষের জীবন

একটি রাষ্ট্রের সভ্যতার পরিচয় তার সুউচ্চ অট্টালিকা, প্রশস্ত সড়ক কিংবা ক্ষমতাবানদের জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপনে পাওয়া যায় না; পাওয়া যায় সেই রাষ্ট্র তার অসহায় নাগরিকের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, তার ওপর। যে মানুষটি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকে, যে দরিদ্র পিতাটি সন্তানের চিকিৎসার ব্যয় জোগাতে শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দেন, যে মা সন্তানের জীবন বাঁচানোর আশায় চিকিৎসকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন—তাঁদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই একটি রাষ্ট্রের মানবিকতার প্রকৃত পরীক্ষা হয়। কারণ অসুস্থতা মানুষকে কেবল শারীরিকভাবে দুর্বল করে না, অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবেও তাকে বিপন্ন করে তোলে। এই বিপন্নতার মুহূর্তে চিকিৎসক হয়ে ওঠেন মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় আশ্রয়গুলোর একটি। সুতরাং চিকিৎসকের আচরণ, তাঁর বিবেক ও পেশাগত শুদ্ধাচার নিছক ব্যক্তিগত নৈতিকতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে একটি সমাজের মানবিক চরিত্রের প্রশ্নটি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।
তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোতে এই প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এসব দেশে দারিদ্র্য, শ্রেণিবৈষম্য, দুর্বল জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামো মানুষের জীবনকে এমনিতেই অনিশ্চিত করে রেখেছে। রাষ্ট্রের নাগরিকেরা যখন পর্যাপ্ত শিক্ষা, পুষ্টি, বাসস্থান ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা পান না, তখন চিকিৎসকের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু এই প্রত্যাশার বিপরীতে যখন চিকিৎসা ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, হাসপাতাল রোগীর পরিবর্তে মুনাফার হিসাবকে প্রাধান্য দেয়, আর চিকিৎসকের পেশাগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাণিজ্যিক স্বার্থের সম্পর্ক তৈরি হয়, তখন সংকটটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা রাষ্ট্রের সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের একটি সম্মিলিত চেহারা ধারণ করে।
আমাদের সমাজে চিকিৎসককে একসময় প্রায় দেবতুল্য মর্যাদায় অভিষিক্ত করা হতো। এই মর্যাদার পেছনে ছিল মানুষের অসহায়তা, চিকিৎসকের জ্ঞান এবং জীবন রক্ষার অসাধারণ ক্ষমতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। কিন্তু কোনো পেশাকে দেবত্বের আসনে বসিয়ে দিলে তার বিপদও আছে। দেবতার কাছে প্রশ্ন করা যায় না, জবাবদিহি দাবি করা যায় না; অথচ চিকিৎসক মানুষ, তাঁর সিদ্ধান্তের সীমাবদ্ধতা আছে, ভুল হতে পারে, এমনকি পেশাগত অসততাও থাকতে পারে। তাই চিকিৎসকের প্রতি অন্ধ আনুগত্য যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অনিয়মের ভিত্তিতে সমগ্র চিকিৎসকসমাজকে অভিযুক্ত করাও অন্যায়। প্রয়োজন হলো চিকিৎসকের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ন রেখে তাঁর পেশাগত দায়িত্বকে জবাবদিহির আওতায় আনা। মর্যাদা ও জবাবদিহি পরস্পরের শত্রু নয়; বরং একটির যথার্থতা অন্যটির ওপর নির্ভরশীল।
তৃতীয় বিশ্বের সমাজে শুদ্ধাচারের আলোচনাটি প্রায়ই ব্যক্তির নৈতিকতা দিয়ে শুরু হয় এবং ব্যক্তির নৈতিকতাতেই শেষ হয়ে যায়। কাউকে ঘুষ না খেতে বলা হয়, কাউকে দুর্নীতি থেকে বিরত থাকতে বলা হয়, কাউকে মানবিক হওয়ার উপদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু যে সমাজে অসততার জন্য পুরস্কার এবং সততার জন্য প্রায়ই মূল্য দিতে হয়, সেখানে কেবল নীতিকথা দিয়ে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একজন চিকিৎসক ব্যক্তিগতভাবে সৎ হতে পারেন, কিন্তু তাঁর কর্মপরিবেশ যদি অস্বাভাবিক রোগীর চাপ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব, অপর্যাপ্ত জনবল, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ ও দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জর্জরিত থাকে, তবে সেই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তাঁর কাজকে প্রভাবিত করবেই। আবার এসব সীমাবদ্ধতার দোহাই দিয়ে ইচ্ছাকৃত অবহেলা, রোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার, কমিশনভিত্তিক চিকিৎসা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারকে বৈধতা দেওয়া যায় না। ব্যক্তির দায় এবং ব্যবস্থার দায়কে পৃথকভাবে বুঝতে হবে, কিন্তু একটিকে ব্যবহার করে অন্যটিকে আড়াল করা চলবে না।
আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি বড় সংকট হলো চিকিৎসা ও বাণিজ্যের মধ্যকার সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান জটিলতা। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধশিল্প এবং চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিপুল অর্থের লেনদেন জড়িত। চিকিৎসাসেবা পরিচালনায় অর্থের প্রয়োজন আছে—এ কথা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। চিকিৎসকের শ্রমের যথাযথ মূল্য দিতে হবে, হাসপাতালের ব্যয় নির্বাহ করতে হবে, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু অর্থের প্রয়োজন আর মুনাফাকে সর্বোচ্চ নৈতিক বিধানে পরিণত করা এক কথা নয়। চিকিৎসা যখন মানুষের প্রয়োজনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তখন অর্থ তার উপকরণ; আর যখন মানুষের অসুস্থতা অর্থ উপার্জনের প্রধান সুযোগে পরিণত হয়, তখন অর্থই চিকিৎসার উদ্দেশ্যকে গ্রাস করে।
এই জায়গায় চিকিৎসকের শুদ্ধাচারের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো, ওষুধ কোম্পানির আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নির্দিষ্ট ওষুধ লিখে দেওয়া, রোগীর প্রয়োজনের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া কিংবা চিকিৎসার ব্যয় সম্পর্কে অস্পষ্টতা বজায় রাখা—এসব আচরণ কেবল নৈতিক বিচ্যুতি নয়; এগুলো ক্ষমতার অসম সম্পর্ককে কাজে লাগানোর উদাহরণ। চিকিৎসক জানেন, রোগী জানেন না। চিকিৎসক রোগের সম্ভাব্য পরিণতি বোঝেন, রোগী প্রায়ই তা বোঝেন না। এই জ্ঞানগত ব্যবধান চিকিৎসককে বিশেষ ক্ষমতা দেয়। শুদ্ধাচার হলো সেই ক্ষমতাকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার না করে রোগীর কল্যাণে প্রয়োগ করা।
তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রে এই ক্ষমতার সঙ্গে শ্রেণিগত বৈষম্য যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ধনী রোগী বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎ পান, উন্নত হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে পারেন, প্রয়োজনে বিদেশে যেতে পারেন। অন্যদিকে দরিদ্র রোগী সরকারি হাসপাতালের দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকেন, শয্যা না পেয়ে মেঝেতে আশ্রয় নেন, কখনো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর অর্থও জোগাড় করতে পারেন না। একই রোগের চিকিৎসা যদি একজনের জন্য সহজলভ্য হয় এবং অন্যজনের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে, তবে সেটি শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক সামর্থ্যের পার্থক্য নয়; এটি স্বাস্থ্যসেবায় সুযোগের অসম বণ্টনের প্রশ্ন। চিকিৎসক একা এই বৈষম্য দূর করতে পারবেন না, কিন্তু নিজের আচরণের মধ্য দিয়ে বৈষম্যকে বাড়িয়ে তুলবেন, নাকি তা কমানোর চেষ্টা করবেন—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার নৈতিক দায়িত্ব তাঁর আছে।
এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার। চিকিৎসকদের শুদ্ধাচার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তাঁদের শ্রমের বাস্তবতা, পেশাগত নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অধিকারকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। তৃতীয় বিশ্বের বহু হাসপাতালেই চিকিৎসকদের বিপুলসংখ্যক রোগী সামলাতে হয়। পর্যাপ্ত জনবল, সময়, অবকাঠামো কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-উপকরণ সব সময় থাকে না। কখনো তাঁরা সহিংসতার শিকার হন, কখনো প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়েন, কখনো এমন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন যেখানে কোনো একটি বিকল্পই সম্পূর্ণ সন্তোষজনক নয়। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে চিকিৎসকদের কাছ থেকে সীমাহীন আত্মত্যাগ দাবি করা ন্যায়সংগত নয়। চিকিৎসককে যেমন তাঁর দায়িত্বের জন্য জবাবদিহি করতে হবে, রাষ্ট্রকেও তেমনি চিকিৎসকের দায়িত্ব পালনের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। যে রাষ্ট্র তার চিকিৎসককে প্রয়োজনীয় উপকরণ দেয় না, অথচ প্রতিটি ব্যর্থতার দায় তাঁর কাঁধে চাপিয়ে দেয়, সে রাষ্ট্র নিজের ব্যর্থতাকেও আড়াল করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমস্যাটি আরও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ দেশের চিকিৎসকেরা সীমিত সম্পদ নিয়ে বিপুল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন। সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থায় বহু চিকিৎসকের নিষ্ঠা, শ্রম ও মানবিকতার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। দুর্যোগ, মহামারি কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের অবদানও অস্বীকার করার উপায় নেই। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের সেবার মান, চিকিৎসকের উপস্থিতি, রোগীর প্রতি আচরণ, রেফারেল-ব্যবস্থা, দালালচক্র, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় এবং বেসরকারি চিকিৎসাসেবার স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রশ্নকে চিকিৎসকবিরোধী প্রচারণা বলে উড়িয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত প্রতিটি অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণভিত্তিক বিচার এবং দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করাই একটি সভ্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষণ।
চিকিৎসকের শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন নৈতিকতাকে বক্তৃতা ও সেমিনারের বিষয়বস্তু থেকে বের করে প্রাতিষ্ঠানিক চর্চায় পরিণত করা। চিকিৎসাশিক্ষায় শুধু রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাপদ্ধতি শেখানো যথেষ্ট নয়; রোগীর অধিকার, informed consent বা অবহিত সম্মতি, গোপনীয়তা, পেশাগত স্বার্থের সংঘাত, জীবনের শেষ পর্যায়ের চিকিৎসা এবং নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে শেখাতে হবে। চিকিৎসককে বুঝতে হবে, রোগী তাঁর কাছে কেবল চিকিৎসা গ্রহণ করতে আসেন না; তিনি নিজের শরীর, ব্যক্তিগত তথ্য ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ওপর চিকিৎসকের জ্ঞানের সহায়তা চান। সেই সহায়তা দেওয়ার অর্থ রোগীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার কেড়ে নেওয়া নয়, বরং তাঁকে সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করে তোলা।
দ্বিতীয়ত, শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর সহজ ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ তদন্তে পেশাগত দক্ষতা এবং নিরপেক্ষতা—দুটিই প্রয়োজন। ভুল চিকিৎসা, অনিবার্য জটিলতা, অবহেলা এবং ইচ্ছাকৃত অসততাকে একই পাল্লায় মাপলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না। চিকিৎসার সব প্রতিকূল ফল অবহেলার কারণে ঘটে না; আবার চিকিৎসার নামে সংঘটিত অবহেলাকে নিছক দুর্ঘটনা বলেও পাশ কাটানো যায় না। তাই চিকিৎসা-সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য দক্ষ, স্বাধীন ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া দরকার, যেখানে রোগী ন্যায়বিচার পাবেন এবং চিকিৎসকও ভিত্তিহীন অভিযোগের বিরুদ্ধে ন্যায্য সুরক্ষা পাবেন।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবার বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলোকে স্বচ্ছ করতে হবে। চিকিৎসক, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ওষুধ কোম্পানির মধ্যে আর্থিক সম্পর্ক থাকলে তার নৈতিক সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। রোগীর প্রয়োজনের বাইরে পরীক্ষা বা ওষুধের ব্যবহার কমাতে প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা, স্বচ্ছ মূল্যতালিকা, কার্যকর নিরীক্ষা এবং স্বার্থের সংঘাত প্রকাশের নিয়ম চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালের সেবার মান উন্নত করা, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, চিকিৎসা-উপকরণ নিশ্চিত করা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করা জরুরি। মানুষ যদি ন্যায্য মূল্যে নিজের কাছাকাছি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায়, তাহলে অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা ও শোষণের সুযোগও কমবে।
চতুর্থত, চিকিৎসকের শুদ্ধাচারকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ বণ্টনে যোগ্যতা ও ন্যায়সংগত মানদণ্ড অনুসরণ করা না হলে পেশাগত নৈতিকতার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে। কোনো চিকিৎসক যদি মনে করেন যে সততার চেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তির সন্তুষ্টি তাঁর কর্মজীবনে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তবে প্রতিষ্ঠান তাঁকে ভুল শিক্ষা দেয়। একইভাবে অনিয়মের অভিযোগ রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা পেশাগত প্রভাবের কারণে ধামাচাপা পড়লে শুদ্ধাচারের কথা অর্থহীন হয়ে যায়। আইনের প্রয়োগ হতে হবে ব্যক্তির পরিচয়ের ঊর্ধ্বে, অপরাধের প্রকৃতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে।
তবে এতসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পরও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়: চিকিৎসক কেন শুদ্ধাচারী হবেন? কেবল চাকরিবিধি, শাস্তির ভয় কিংবা পেশাগত সনদ হারানোর আশঙ্কা থেকে? এগুলোর প্রয়োজন আছে, কিন্তু এগুলো যথেষ্ট নয়। একজন চিকিৎসকের নৈতিকতার গভীরে থাকা উচিত মানুষের জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতনতা। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু মানুষের মৃত্যু, যন্ত্রণা ও অসুস্থতার সব রহস্য এখনো সমাধান করতে পারেনি। চিকিৎসকের দায়িত্ব তাই সব রোগ সারিয়ে তোলার অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেওয়া নয়; বরং নিজের সর্বোচ্চ জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োগ করা, প্রয়োজন হলে অন্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া, ভুল হলে তা স্বীকার করা এবং রোগীর সঙ্গে সত্যনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা। চিকিৎসকের মানবিক মহত্ত্ব তাঁর সর্বজ্ঞ হওয়ার ভান করার মধ্যে নয়, বরং নিজের সীমাবদ্ধতা জেনেও দায়িত্বশীল থাকার মধ্যে।
একটি সমাজ তার চিকিৎসকদের কাছ থেকে সততা চাইবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই সমাজকে নিজের দিকেও তাকাতে হবে। যে সমাজ দুর্নীতিকে কৌশল, প্রতারণাকে বুদ্ধিমত্তা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকে সাফল্য বলে গণ্য করে, সে সমাজের মধ্যে চিকিৎসকের নৈতিক অবক্ষয়কে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। অবশ্য সমাজের সামগ্রিক অবক্ষয় কোনো ব্যক্তির অসততার অজুহাত হতে পারে না। বরং চিকিৎসকের পেশাগত দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ তাঁর সিদ্ধান্তের পরিণতি সরাসরি মানুষের জীবন ও মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত। অন্য পেশায় অসততা কখনো আর্থিক ক্ষতি ঘটাতে পারে; চিকিৎসায় অসততা কিংবা গুরুতর অবহেলা মানুষের জীবনকে বিপন্ন করতে পারে। এই বিশেষ দায়িত্বই চিকিৎসা পেশাকে নৈতিকতার উচ্চতর মানদণ্ডের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
আমাদের মনে রাখতে হবে, শুদ্ধাচার কোনো সাইনবোর্ডের শব্দ নয়, কোনো সরকারি পরিপত্রের অলংকারও নয়। এর মূল্য নির্ধারিত হয় বাস্তব আচরণে। চিকিৎসক যখন রোগীর কথা শোনেন, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা এড়িয়ে চলেন, চিকিৎসার ব্যয় সম্পর্কে স্বচ্ছ থাকেন, রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করেন এবং নিজের ভুল সংশোধনে প্রস্তুত থাকেন, তখন শুদ্ধাচার জীবন্ত হয়ে ওঠে। হাসপাতাল যখন দরিদ্র ও ধনী রোগীর জন্য ন্যায়সংগত সেবার পরিবেশ তৈরি করে, রাষ্ট্র যখন স্বাস্থ্যকে নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এবং পেশাগত প্রতিষ্ঠান যখন প্রভাবশালী ও সাধারণ চিকিৎসকের ক্ষেত্রে একই নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োগ করে, তখন সেই শুদ্ধাচার সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়।
তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর সামনে আজকের বড় চ্যালেঞ্জ কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়; উন্নয়নের সুফল মানুষের জীবনে কতটা ন্যায়সংগতভাবে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যে উন্নয়ন মানুষের আয় বাড়ায় কিন্তু চিকিৎসাকে তার নাগালের বাইরে ঠেলে দেয়, যে নগরায়ণ হাসপাতাল নির্মাণ করে কিন্তু দরিদ্রের চিকিৎসার নিশ্চয়তা দেয় না, যে বাজার নতুন ওষুধ ও প্রযুক্তি নিয়ে আসে কিন্তু রোগীকে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ফেলে—সেই উন্নয়নের মানবিক ভিত্তি দুর্বল থেকে যায়। চিকিৎসকদের শুদ্ধাচার তাই এই বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নেরই অংশ। এটি চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চরিত্রের পরীক্ষা, একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ন্যায়বোধ, প্রতিষ্ঠানের সততা এবং সমাজের মানবিকতারও পরীক্ষা।
পরিশেষে বলা যায়, চিকিৎসককে দেবতা বানানোর প্রয়োজন নেই; তাঁকে দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে সম্মান করাই যথেষ্ট। তাঁর শ্রমের মর্যাদা দিতে হবে, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, স্বাধীন পেশাগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে এবং একই সঙ্গে তাঁর ক্ষমতার যথাযথ জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রোগীকে করুণার পাত্র নয়, অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। আর রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, স্বাস্থ্যসেবা কোনো দয়ার দান নয়, মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত একটি জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব।
যেদিন একজন দরিদ্র মানুষ হাসপাতালের দরজায় দাঁড়িয়ে নিজেকে অসহায় মনে করবেন না, যেদিন চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করার আগে তাঁকে ভাবতে হবে না যে তাঁর আর্থিক সামর্থ্যই চিকিৎসার মান নির্ধারণ করবে, যেদিন চিকিৎসকও বাণিজ্যিক চাপ ও প্রশাসনিক অনিয়মের ঊর্ধ্বে থেকে নিজের পেশাগত বিবেক অনুসারে কাজ করতে পারবেন—সেদিনই চিকিৎসকদের শুদ্ধাচার প্রকৃত অর্থে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে এগোবে। কারণ শুদ্ধাচারের চূড়ান্ত সাফল্য চিকিৎসকের প্রশংসাপত্রে নয়, মানুষের আস্থায়; হাসপাতালের দেয়ালে টাঙানো নীতিবাক্যে নয়, অসুস্থ মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রতিফলনে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয় এই নয় যে সেখানে কতজন চিকিৎসক আছেন; বরং এই যে, সেখানে চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার কতটা সুরক্ষিত, চিকিৎসকের বিবেক কতটা স্বাধীন এবং মানুষের জীবন কতটা মূল্যবান বলে বিবেচিত হয়।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






