প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, হাইকোর্টের রায় ও সংবিধান অনুযায়ী দুদক কমিশনারের রাষ্ট্রপতি হতে কোন আইনগত বাধা নেই। সুতরাং এটা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কিছু নেই।
বুধবার দুপুরে নির্বাচন ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কথা বলেন সিইসি। তবে রাষ্ট্রপতি পদ লাভজনক কিনা সে বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
একক প্রার্থী হওয়ায় যাচাই বাছাই শেষে মোননায়নপত্র বৈধ হওয়ায় সোমবার দেশের বাইশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে আওয়ামী লীগ মনোনিত সাবেক দুদক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন কে নির্বাচিত ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
তবে এরপর থেকেই কিছু মহলে বিতর্ক ওঠে তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল।
সিইসি বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে মোঃ সাহাবুদ্দিনকে ইসি থেকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। আইন অনুযায়ী নির্বাচিত ঘোষণা করেছে কমিশন। দুদক আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী কোন কমিশনার অবসরের পর লাভজকন পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হতে পারবেন না। তবে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ দেয়নি সংবিধান অনুযায়ী তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করেছে।
নিয়োগ এবং নির্বাচিত দুটি প্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন তিনি। ১৯৯৬ সালে রায়ের কথা উল্লেখ করে সিইসি বলেন, কমিশনার কিংবা বিচারপতি পদ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হতে বাধা নেই। রাষ্ট্রপতি নিয়োগ নিয়ে অবান্তর প্রশ্ন তোলা হলে সেটি অনাকাঙ্ক্ষিত বলেও মনে করেন সিইসি।
তবে রাষ্ট্রপতি পদটি লাভজনক কিনা সে বিষয়টি স্পষ্ট করেননি খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
সিইসি বলেন: বিগত ১২ তারিখে আমরা রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পেয়েছিলাম। সংসদের দু’জন সংসদ সদস্য প্রস্তাবক এবং সমর্থন করেছেন। রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ওটাতে সম্মত হয়ে তার স্টেটমেন্ট দিয়েছেন।
তিনি জানান, নিয়ম অনুযায়ী, সংবিধান, সহায়ক আইন এবং সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী আমাদেরকে এই নির্বাচনটি পরিচালনা করতে হয়। আমরা তফসিল করেছিলাম। তফসিল অনুযায়ী ১২ তারিখে মনোনয়ন পেয়েছি। বাছাইয়ের জন্য নির্ধারিত ছিল। বাছাইয়ের কাজটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার তথা নির্বাচনী কর্তা একক এবং অবিভাজ্য। এটা কমিশনের কোনো দায়িত্ব ছিল না। দায় দায়িত্ব, ভুলভ্রান্তি সবকিছুর দায়ভার প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে এককভাবে নিতে হবে। সেই জন্যই যেহেতু বিষয়টি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের উপর অর্পিত একটি একক ও অবিভাজ্য দায়িত্ব অর্পিত ছিল। তাই আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাম নির্বাচনী কর্তা হিসেবে কিছু কিছু উত্থাপিত বিষয়ে বিভ্রান্তি নিরসনেরর সুবিধার্থে কিছু বক্তব্য উপস্থাপন আবশ্যক মনে করছি।
সিইসি বলেন: একটি প্রশ্ন উঠেছে যে, প্রার্থীর সাংবিধানিক বা আইনগত অযোগ্যতা রয়েছে। এটা সত্য যে দুদক আইনে ৯ ধারায় বলা হয়েছে যে কর্মাবসানের পর কোনো কমিশনার প্রজাতন্ত্রের লাভজনক কোনো পদে নিয়োগ লাভে যোগ্য হবেন না। এটা আছে। এটার আলোকে বিষয়টি বিবেচ্য। এতে করে অনেকে বলতে চেয়েছেন যে, রাষ্ট্রপতির পদটি একটি লাভজনক পদ।
হাবিবুল আউয়াল বলেন: আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচনী কর্তা হিসেবে ওই রায়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত ছিলাম। কারণ পরীক্ষা করার সময় যেটাকে বাছাই বলে সেটা কিন্তু একটা দায়সারা গোছের দায়িত্ব নয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে হবে, প্রার্থী যাই বলুক কমিশনারেরও দায়িত্ব আছে বাছাই করে দেখা যে, প্রার্থীর কোনো সাংবিধানিক বা আইনগত অযোগ্যতা রয়েছে কি-না। আমরা দেখলাম প্রথমত স্পষ্টত কোনো আইনগত অযোগ্যতা নেই এই কারণে, ৯ ধারায় (দুদক আইনের) বলেছে, কোনো লাভজনক পদে নিয়োগ লাভে যোগ্য হবেন না। আমরা কিন্তু এখান থেকে প্রার্থীকে নিয়োগ দান করিনি। প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দান করেননি। প্রধান বিচারপতিও নিয়োগ দান করেননি। কেউ নিয়োগ দান করেননি এবং কেউ নিয়োগ দান করতে পারেন না। উনি নির্বাচিত হয়েছেন। আইন তাকে নির্বাচিত করেছি প্রচলিত প্রথা অনুসরণ করে।
নির্বাচন এবং নিয়োগের মধ্যে যে পার্থক্য এটা বুঝতে হবে জানিয়ে সিইসি বলেন: তাকে যদি এখান থেকে নিয়োগ দান করা হতো, তাহলে সেটি অবশ্যই অবৈধ হতো। কারণ নিয়োগ দানের কর্তৃপক্ষ বা কর্তৃত্ব আমাদের নেই, কারোই নেই। যেমন আমাদের জাতীয় সংসদের সদস্যগণ নিয়োগপ্রাপ্ত হন না। তারা নির্বাচিত হন। সেটাই তাদের নিয়োগের সমতুল্য। অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমেদ সাহেব যখন রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এই বিষয়ে রিট মামলা হয়েছিল। সেই মামলায় বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, শাহাবুদ্দীন আহমেদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পূর্ণ বৈধ। এতে কোনো অবৈধতা হয়নি।
আর আলোচনায় তিনি বলেছেন, পদটি অফিস অব প্রফিট হলেও এটা অফিস অব প্রফিট ইন দ্য সার্ভিস অব দ্য রিপাবলিক নয়। সেখানে বিভাজন করে দেখানো হয়েছে। আমরা সেই প্রশ্নে না গিয়ে যেহেতু সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত একটি রায় বলে দিয়েছে যে, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি ঠিক তেমনি একজন অবসরপ্রাপ্ত দুদকের কমিশনার রাষ্ট্রপতি পদে কোনোভাবেই অবৈধ নয়। সেই দিক থেকে এই প্রশ্নে বিভ্রান্তি সৃষ্টি বিভিন্ন ধরণের মতামত দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিটা অনাবশ্যক বা সমীচিন হবে না বলে আমি মনে করি।
‘উনি নির্বাচিত হয়েছেন পরোক্ষভাবে পুরো দেশবাসীর পক্ষে, প্রত্যক্ষভাবে জাতীয় সংসদের সদস্যদের দ্বারা। যেহেতু একজনমাত্র প্রার্থী ছিলেন এবং তার দুইটি মনোনয়নপত্র ছিলো। আমি সেটি পুঙ্খানুপুঙ্খুভাবে দেখেছি এবং প্রচলিত যে আইন কানুন সংবিধান সবকিছু বিবেচনা করে দেখেছি। তার (মো. সাহাবুদ্দিন) এই পদে নির্বাচিত হতে কোনো ধরণের অযোগ্যতা নেই’, বলেন সিইসি।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির প্রশ্নে যদি এই ধরণের অবান্তর বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়, সেটা হবে অনাকাঙ্খিত।
‘সাংবিধানিক পদে তো আপনারাও, অবসরে যাওয়ার পর আপনাদের কি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে যেতে বাধা থাকছে?’ জানতে চাইলে সিইসি বলেন, আপনি আমাকে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে দেখেন, তখন আমি দেখবো সেটা গ্রহণ কতরতে পারবো কি পারবো না। আমি ওই পদে নিয়োগ লাভে যোগ্য হবো না। আমাদের ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশনার যারা আছেন তাদের ক্ষেত্রে শুধু একটা অপশন আছে যে উনারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগ লাভ করতে পারবেন। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কর্মাবসানের পর তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে পুন:নিয়োগ লাভে অযোগ্য হবেন।
‘তাহলে কি নির্বাচন করতে পারবেন?’ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি মনে করি আমি নির্বাচন করতে পারবো। আমার ব্যক্তিগত মত। সেই ক্ষেত্রে ওখানে যদি বলে আমি নিয়োগের অযোগ্য তো আমি একটি যুক্তি নিতে পারি যে, আমি নিয়োগের অযোগ্য কিন্তু নির্বাচনের অযোগ্য নই।
২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করবেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন।







