বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ঘোষিত ২০২৫ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে নাটকীয় মোড় নেয় কবি মোহন রায়হানকে ঘিরে। কবিতায় পুরস্কারপ্রাপ্ত হিসেবে সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) তার নাম ঘোষণা করা হলেও, বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) পদক প্রদান অনুষ্ঠানে শেষ মুহূর্তে তাকে আর ডাকা হয়নি- এমন অভিযোগ তুলেছেন তিনি নিজেই।
বৃহস্পতিবার দুপুরে একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্যান্য পুরস্কারজয়ীদের হাতে পদক তুলে দেন। কিন্তু কবিতায় ঘোষিত বিজয়ী মোহন রায়হানের নাম আর উচ্চারিত হয়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মোহন রায়হান দাবি করেন, ৪১ বছর আগে কর্নেল তাহেরকে নিয়ে লেখা তার কবিতা ‘তাহেরের স্বপ্ন’–কে কেন্দ্র করে একটি মহল প্রধানমন্ত্রীর কাছে আপত্তি জানায়। এর জেরেই তার পুরস্কার বাতিল করা হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।
চ্যানেল আই অনলাইনকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় কবি বলেন, “আমি কখনো কাউকে কোনোদিন বলিনি আমাকে পুরস্কার দিতে। কোনোদিন পুরস্কারের জন্য তদবির করিনি। আমি পুরস্কারের জন্য লিখি না—মানুষের অধিকারের জন্য কবিতা লিখি।”
তিনি বলেন, পুরস্কার ঘোষণার পর বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) তাকে এসএসএফের মাধ্যমে পুরস্কার গ্রহণের রিহার্সেলেও অংশ নিতে ডাকা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে কীভাবে পদক গ্রহণ করতে হবে, সে বিষয়ে মহড়া হয়। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর আগে একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম আমাকে ডেকে জানান, কর্নেল তাহেরকে নিয়ে লেখা আমার একটি কবিতা নিয়ে আপত্তি উঠেছে এবং এ কারণে পুরস্কার স্থগিত হতে পারে।
মোহন রায়হানের ভাষ্য অনুযায়ী, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি তাকে বলেন, “কিছু মনে করবেন না, আপনার পুরস্কার প্রয়োজনে আমরা বাসায় পৌঁছে দেব।”
এ প্রস্তাবে মর্মাহত কবি বলেন,“আমি কি পুরস্কারের এতটাই কাঙাল? আমি কি কোনো লবিং বা তদবির করেছি? আমার সঙ্গে যা হলো, তা শুধু একজন কবির সঙ্গে নয়- পুরো সাহিত্য সমাজের জন্যই ক্ষত হয়ে থাকবে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান শুরুর আগে তাকে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করা হয়েছে, তবে তিনি সেই আহ্বানে সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন,“তার (মোহন রায়হান) লেখা ও কবিতা বিষয়ে কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায়, তা খতিয়ে দেখার স্বার্থে কর্তৃপক্ষ পুরস্কার সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে খুব শিগগিরই জানানো হবে।”
তবে কী ধরনের অভিযোগ বা কার পক্ষ থেকে তা উত্থাপিত হয়েছে এ বিষয়ে কেউ বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এদিকে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সাহিত্য অঙ্গনে নানা প্রশ্ন ও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একটি রাষ্ট্রীয় সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণার পর, এমনকি রিহার্সেল সম্পন্ন হওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে একটি মহলের চাপে একজন কবির সাথে এমন আচরণের নিন্দা জানাচ্ছেন অনেকে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার মোট আটটি বিভাগে নয়জনকে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। কবিতায় মোহন রায়হান ছাড়া কথাসাহিত্যে নাসিমা আনিস, প্রবন্ধ/গদ্যে সৈয়দ আজিজুল হক, শিশুসাহিত্যে হাসান হাফিজ, অনুবাদে আলী আহমদ, গবেষণায় মুস্তাফা মজিদ ও ইসরাইল খান, বিজ্ঞানে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী এবং মুক্তিযুদ্ধে মঈদুল হাসানকে পুরস্কার দেয়া হয়।








