কবি-লেখক-কলামিস্ট মনজুর রশীদের লেখা দুটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল গতবছর আয়োজিত একুশের বইমেলাতে। বই দুটি ছিল ‘অনুভূতির উঠোন জুড়ে’ এবং দৃশ্যমান জনশ্রোতে অদৃশ্য দৃশ্যমানতা’। এবারের বইমেলাতে এসেছে তার নতুন কবিতার বই ‘আমার ক্ষুব্ধতা তোমার নির্মম লজ্জাহীনতায়’। বইটি প্রকাশ করেছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সূচীপত্র।
মনজুর রশীদের এবারের কবিতার বই-এ মোট ৫৬টি কবিতা স্থান পেয়েছে। কবিতার শিরোনাম- ‘আমার ক্ষুব্ধতা তোমার নির্মম লজ্জাহীনতায়’, ‘কেউ থাকেনি ঘরে’, ‘হোক অবমান’, ‘দম্ভ চূর্ণ’, ‘মৃত্যু এত সহজ কেন’, ‘হায়রে মহামান্য’, ‘তারুণ্য নির্ভীক’, ‘জেগে ওঠার দিন’, ‘স্বপ্ন ভাঙার বিষাদ’, ‘অভাব ও ভাব’, ‘পড়ন্ত বেলায় এসে’, ‘বাস্তবতা’, স্বপ্ন ভাঙার বিস্বাদ’, ‘শোক নয়’ ইত্যাদি।
বেশির ভাগ কবিতাই সমসাময়িক লেখা। বিশেষ করে জুলাই-আগস্ট-এ শেখ হাসিনার অপশাসনের বিরুদ্ধে তারুণ্যের লড়াই, রাজপথে ছাত্র-জনতার উত্তাল প্রতিবাদ, হামলা-মামলা, গুম, জেলজুলুম এসবই বেশিরভাগ কবিতায় তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন।
তার লেখা এসব কবিতাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘বিগত স্বৈরাচারের যেসব অন্যায়, কালাকানুন, সিদ্ধান্ত যখন ভালো লাগেনি তখনই কলম হাতে তুলে নিয়েছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছি। যেখানে প্রতিবাদ করার প্রতিবাদ করেছি। নিজের পরিসরে নিজেই প্রতিবাদের চিহ্নটুকু রেখে গেছি। অন্যায় হলে প্রতিবাদ করতেই হবে।’
মনজুর রশীদের নতুন এই কবিতার বই-এর শিরোনামেই যে কবিতা ‘আমার ক্ষুব্ধতা তোমার নির্মম লজ্জাহীনতায়’ সেখানে তিনি লিখেছেন- ‘শেকড়যুক্ত চারা উৎপাটনের অভিপ্রায় নিয়ে/সবাইকে বন্দী করে রেখেছে/কেউবা জেলের চার দেওয়ালের মাঝে/বাকিরা নামে মুক্ত শৃঙ্খলিত হয়ে। এ কবিতায় তিনি মূলত গণতন্ত্রহীনতার কথা বলেছেন। বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার কীভাবে ভূলুণ্ঠিত সে কথাই বলেছেন।
জুলাই-আগস্টে যখন রাজপথে শাসকের সাথে ছাত্র-জনতার লড়াই-এ মানুষের রক্তে সয়লাব হচ্ছিল রাজপথ সেই সময়ের কথা তিনি উচ্চারণ করেছেন ‘কেউ থাকেনি ঘরে’ কবিতায়। বলেছেন, কী ভয়ানক ডাইনি বুড়ি/ভয়ানক কালবেলা/উত্তাল ঐ গণমিছিলে/মানুষ খুনের খেলা।’ ক্ষুব্ধ হয়েই বলেছেন মনের গহীনে জমে থাকা কথা। আবু সাঈদ নিহত হওয়ার পর মনজুরের কলম থেমে থাকেনি। কবিতায় বলেছেন মনের অনুভূতি, আকুতি, ক্ষোভ-বিক্ষোভ। ‘তারুণ্য নির্ভীক’ কবিতায় সাঈদ, মুগ্ধকে ভালোবেসে কাছে টেনে নিয়েছেন।
বলেছেন, ‘তারুণ্য আজ ঐ ছুটেছে আবু সাঈদের হয়ে/শান্তরা আজ অশান্ত যে তাজা রক্ত ছুঁয়ে/চারিদিকে ধনবাদ্য দেখিছি শুধুই বাজে/চালাস গুলি হায়েনার দল মাথা বুকও মাঝে।’ ভণ্ড, কপটদের বিরুদ্ধে কথা বলতে ছাড়েননি। বিশেষ করে ছদ্মবেশীদের চরিত্রদের নিয়ে বলেছেন, ‘যাকেই ভাবি মহামানব/ মহান সেতো নয়/ মুখোশধারী মহামানব বুঝতে দেরী হয়।’ ছোট্ট কথা তুলে ধরেছেন মুখোশধারীদেরদের। মনজুর রশীদের মতে, তিনি কারও শিকলে বন্দী নন। একেবারে মুক্ত। কারো কৃপা বা দয়ায় চলেন না। নিজের চিন্তাভাবনা থেকেই সত্য ও সুন্দরটাকে বলার চেষ্টা করেন।
তিনি কিছু কিছু কবিতায় বলেছেন চারপাশের জীবনের গল্পও। টানাপোড়নের এই সমাজ ও জীবনের অনেক ধরনের মনস্তত্ব তিনি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন কবিতার কথামালায়। ‘বিষন্নতা’ নামে কবিতায় উচ্চারণ করেছেন, ‘মন ভালো নেই, কোনো সুখ নেই/ নিকট জনেরা সবাই জানে/ইনি রেগে আছেন/উনি ক্ষেপে আছেন/ বক্তারা বলে শুধু এসে কানে।আবার বলেছেন হাসিখুশি নিয়ে বেঁচে থাকাই জীবন। কী হবে শুধু শুধু মন খারাপ করে। তাইতো ‘হাসি’ কবিতায় বলেছেন, ‘সারাজীবন হেসেই গেলাম/বুঝতে দেইনি কাষ্ঠ/হাহা হিহি হোহো করেও হয়নি সময় নষ্ট। আরও এরকম অনেক কবিতায় আছে জীবনের চারপাশের কথা। আছে স্বপ্ন আর সাধ্যের কথাও। আছে প্রিয়জন হারানোর কথাও।
মনজুর রশীদ পেশায় উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ। অনেক দিন ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কাজ করছেন। প্রান্তিক ও নৃতাত্তিক জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার সংরক্ষণ ও জীবনমান উন্নয়নে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনি গিয়েছেন পেশাগত কারণেই। দেখেছেন এদেশের বহু বৈচিত্র্যময় সামাজিক ব্যবস্থা। দেখেছেন মানুষের জীবন-সংগ্রাম, বেঁচে থাকার শত চেষ্টা। সেইসব মানুষের দুঃখ-বেদনা তিনি হৃদয়ে ধারণ করেন। তাদের কথামালা তিনি দেশে বিদেশের বিভিন্ন ফোরামে তিনি ধরছেন অনেক অনেকদিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান থেকে লেখাপড়া করা মনজুর রশীদ বরাবরই প্রতিবাদী এবং প্রগতিশীল মনের এক মানুষ। আশি ও নব্বই দশকে মৌলবাদ ও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন রাজপথে। বুকে বিদ্রোহ ধারণ করেন। সমস্ত ধরনের ধর্মীয় রাজনীতি ও গোঁড়ামীর বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার। একসময় মঞ্চ নাটকে যুক্ত ছিলেন। সাংবাদিকতাও করেছেন। অভিনয়, আবৃত্তিও বাদ যায়নি। সাংস্কৃতিক লড়াই-এ এখনও তিনি সোচ্চার। মনজুর রশীদ মনে করেন, জীবন কবিতার মতোই। পড়তে পড়তে অনুভব করা যায়। জীবন সুন্দর। জীবনে তাই বিষাদের সব বৃত্ত ভেঙে প্রচুর হাসি আনন্দ প্রয়োজন। তিনি আরও মনে করেন সুন্দর এই দেশ, এই রাষ্ট্র। এই দেশকে সমস্ত ধর্মীয় মৌলবাদ ও গোড়ামীর ঊর্ধ্বে নিয়ে নতুন এক গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ করতে পারলেই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ হবে আরও অগ্রগামী আরও অগ্রসর, আরও আলোকিত এবং প্রগতিশীল।








