শিল্প সাহিত্য

নাগরিক জীবন থেকে স্বাধীনতার কবিতা, শামসুর রাহমানের ৯৮তম জন্মদিন

নাগরিক জীবন থেকে স্বাধীনতার কবিতা, শামসুর রাহমানের ৯৮তম জন্মদিন
বাংলা কবিতায় নাগরিক জীবনের নিঃসঙ্গতা, প্রেমের অনুভূতি, প্রতিবাদের ভাষা আর স্বাধীনতার স্বপ্নকে যারা স্বতন্ত্র কাব্যভাষায় তুলে ধরেছেন, কবি শামসুর রাহমান তাদের অন্যতম। তার কবিতায় একদিকে যেমন ধরা পড়েছে নগরজীবনের আনন্দ-বেদনা, অন্যদিকে তেমনি উচ্চারিত হয়েছে মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারার এই বিশিষ্ট কবির ৯৮তম জন্মদিন আজ।

১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার মাহুতটুলীতে জন্মগ্রহণ করেন শামসুর রাহমান। ডাকনাম ছিল বাচ্চু। তার বাবা মোখলেসুর রাহমান চৌধুরী এবং মা আমেনা বেগম। লেখক হিসেবে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলার প্রত্যয়ে নাম থেকে পৈতৃক উপাধি ‘চৌধুরী’ বাদ দেন তিনি। ঢাকার অলিগলি, নাগরিক জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও সময়ের পরিবর্তন তার কবিতার জগৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। এরপর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছড়া ও অনুবাদসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় রেখেছেন স্বতন্ত্র স্বাক্ষর। তার রচনায় ব্যক্তিমানুষের অনুভূতি যেমন গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনি স্থান পেয়েছে সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সমকালীন জীবনের নানা সংকট।

শামসুর রাহমানের কবিতার অন্যতম শক্তিশালী দিক বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতার চেতনাকে কাব্যিক ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করা। ‘স্বাধীনতা তুমি’ এবং ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কবিতায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পেয়েছে গভীর আবেগময় প্রকাশ। সেখানে স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়; বরং মানুষের স্বপ্ন, স্বতঃস্ফূর্ত জীবনযাপন, প্রকৃতি ও প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সঙ্গে মিশে থাকা এক অনিবার্য আকাঙ্ক্ষা।

তার কবিতায় প্রতিবাদও এসেছে নানা রূপে। স্বৈরাচার, সামাজিক অসংগতি, বৈষম্য ও মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে তিনি উচ্চারণ করেছেন দৃঢ় অবস্থান। একই সঙ্গে প্রেম, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বোধ তার কবিতাকে দিয়েছে বহুমাত্রিকতা। নাগরিক জীবনের ক্লান্তি কিংবা মানুষের একান্ত অনুভূতিকে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার ক্ষমতা তাকে বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্র অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

দীর্ঘ সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে শামসুর রাহমান পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদকসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা। কবিতা ছাড়াও সাংবাদিকতা ও অনুবাদে তার অবদান বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ৬৬টি কাব্যগ্রন্থ, চারটি উপন্যাস, একটি প্রবন্ধগ্রন্থ, একটি ছড়ার বই ও ছয়টি অনুবাদগ্রন্থ।

২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন এই কবি। তবে তার প্রস্থান বাংলা কবিতায় রেখে যাওয়া প্রভাবকে মুছে দিতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে বদলেছে সমাজ ও মানুষের জীবন, কিন্তু স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, প্রতিবাদের প্রয়োজনীয়তা, প্রেম ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নগুলো আজও প্রাসঙ্গিক।

শামসুর রাহমানের কবিতা তাই কেবল সাহিত্যপাঠের বিষয় নয়; তা বাংলাদেশের ইতিহাস, নাগরিক অভিজ্ঞতা ও মানুষের মুক্তির স্বপ্নেরও এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তার জন্মদিনে ফিরে দেখা যায় এমন এক কবিকে, যিনি শব্দের ভেতর দিয়ে সময়কে ধারণ করেছেন, আর কবিতাকে করে তুলেছেন মানুষের আশা, প্রতিবাদ ও স্বাধীনতার ভাষা।

বিষয়:কবি কবিতা শামসুর রাহমান

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…