বিশিষ্ট কবি হেলাল হাফিজের বিখ্যাত কবিতার অনুসরণই এখন যেনো সত্যিতে পরিণত হয়েছে- ইসরায়েল বোমা বোঝো, মানুষ বোঝো না। গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনে কাতারে কাতারে মরছে নারী, শিশু ও নিরস্ত্র মানুষ। বিশ্ব বিবেক ঘুমিয়ে থাকলেও জেগে উঠেছে বাংলাদেশ।
ঢাকায় লাখো মানুষের মার্চ ফর গাজা হলো। কিন্তু ৫৭টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র, ওআইসি ও আরব লীগের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। আটশো কোটি মানুষের চোখের সামনে সম্প্রতি ৬০ হাজারেও বেশি মানুষ হত্যা করা হলো গাজায়। জাতীসংঘের নীরব ভুমিকার বিরুদ্ধে আরব রাষ্ট্রগুলো কেন আরো সোচ্চার না- এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে বিবেকবান মানুষের মধ্যে।
গাজার এই পরিস্থিতির সুযোগে যদি দেশে দেশে যদি জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদের উত্থান ঘটে-তার দায় কে নেবে মিজানুর রহমান আজহারীসহ ওলামা মাশায়েখরা রাস্তায় নেমে এসেছেন। আর কি করতে পারে মুসলিম উম্মাহ। মুসলিম বিশ্বের পাশ্চাত্য নির্ভরতার কারণেই কি তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে পারে না। এই যে মানবতাবিরোধী অপরাধ চলছে গাজায়।
আন্তর্জাতিক আইন কি বলে? আইনি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ এবং মুসলিম বিশ্বের এই বিষয়ে করণীয় কিছু আছে কি? মুসলিমরা আন্তর্জাতিক আদালত এবং মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনালে যেতে পারে কি। নাকি এসব ট্রাইব্যুনালও ইহুদি ও নাসারাদের ইশারায় চলে। জাতীসংঘ ও বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থাগুলো কি নিশ্চুপ্। এই দায় কি এড়াতে পারে তারা। ফিলিস্তিনে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার দায়িত্ব কি শুধু মুসলমানদের, না-কি বিশ্ব মানব সভ্যতার- এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর দেবে কে?
গাজার পরিস্থিতি মূলত ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চলমান যুদ্ধ। যা এখন বিশ্ব ভাবনার প্রধান মাথা ব্যথায় পরিণত হয়েছে। কিনউত ব্যথা উপশমের পথে হাঁটছে না কেউ। এর ফলে মুখ থুবড়ে পড়েছে বিশ্ব মানবতা। মুহুর্মুহু ইসরায়েলি হামলায় গাজা স্ট্রিপ নামের ক্ষুদ্র উপকূলীয় ছিটমহলটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিরা জীবন বাঁচানোর জন্য হাহাকার করছে।
বিধ্বংসী বিমান হামলা আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে এবং বিস্ফোরণে উড়ন্ত ধ্বংসাবশেষের আঘাতে অসংখ্য মানুষ হতাহত হয়েছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ক্ষমতাসীন হামাসের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন প্রতিশোধ নেয়ার অঙ্গীকার করেছে ইসরায়েল।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী গাজায় স্থল অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং আইডিএফ, ইসরায়েল প্রতিরক্ষাবাহিনী প্রতিটি হামাস সদস্যকে নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিশ্বের সমস্ত গণমাধ্যম ব্রেকিং নিউজ দিচ্ছে ঘন্টায় ঘন্টায়।
নিরীহ নিরস্ত্র গাজাবাসীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত লাগাতার আক্রমণের বীভৎসতা বিশ্ববাসীকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে। বিশ্ব বিবেক এই নিষ্ঠুরতা দেখে নিষ্ফল উদ্বেগ প্রকাশ করছে। মানবাধিকারকর্মীরা হা-পিত্যেশ করছে। খেউড়ে খিস্তি করছে। কিন্তু উত্তেজনা প্রশমনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পক্ষান্তরে, বিদ্রোহী পক্ষগুলো তাদের নিজ নিজ যুদ্ধ লড়ছে আর পরস্পর পরস্পরের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছে।
পক্ষবিশেষের প্রতি সমর্থন-অসমর্থন একান্তই নিজস্ব বিবেচনার ব্যাপার। কিন্তু নিরপরাধের রক্তক্ষরণ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। যদিও গাজায় যা ঘটছে তার জন্য কেউ দায় নিতে চায় না, তবুও কমবেশি সবাই দায়ী। একদিকে রক্তপিপাসু ইসরায়েলিদের জাতিগত আত্মশ্লাঘা এবং অন্যদিকে হিংস্র হামাসের ধর্মান্ধ জিঘাংসা নিরীহ ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।
উপরন্তু, ইসরায়েলকে দেয়া মার্কিনীদের নির্লজ্জ প্রশ্রয়, মার্কিন-মিত্রদের প্রকাশ্য উদাসীনতা, জাতিসংঘের কুমিরের কান্না এবং আরব লীগের কৃত্রিম উদ্বেগ প্রতিহিংসার আগুনে ঘি ঢেলে দেয়ার মতো ব্যাপার হয়ে উঠেছে। কিন্তু কিছুই এই অন্তহীন পৈশাচিকতা থেকে মুক্তির পথ দেখায় না। আর এভাবে চলতে থাকলে সম্ভাব্য দৃশ্যকল্প কি হতে যাচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়।
অবশ্য আপাতদৃষ্টিতে এটা মনে হতে পারে, গাজা ভূখণ্ডে ইহুদিদের এই বিরামহীন আক্রমণ ইসরায়েলের ওপর ভয়াবহ আকস্মিক হামলাকারী হামাস যোদ্ধাদের ওপর একটি যথোচিত প্রতি-আক্রমণ, কিন্তু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের পূর্ণাঙ্গ কাহিনির পরিপ্রেক্ষিতে, হামাসের এই আকস্মিক আক্রমণকে অপ্ররোচিত সামরিক আগ্রাসন বলে মনে হবে না। বরং তা দীর্ঘদিনের ইসরায়েলি আক্রমণ, আটক, নির্যাতন, উচ্ছেদ এবং হত্যার বিরুদ্ধে হামাস কর্তৃক পরিচালিত পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও আক্রোশজাত সুপরিকল্পিত এক প্রতি আক্রমণ এবং ইসরায়েলের কঠোর সামরিক প্রতিশোধ থেকে মুক্তির সশস্ত্র উপায়।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বের গল্প প্রায় ৭০ বছর ধরে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। ফিলিস্তিনিরা ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র সৃষ্টির আগে ব্রিটিশ নির্দেশিত (১৯২০-৪৭) ফিলিস্তিনে বসবাস করত এবং তাদের বংশধররা ইসরায়েলি দখলদারিত্ব থেকে মুক্তির জন্য প্রাণপণে লড়াই করছে।
অন্যদিকে, ইহুদিরা তাদের তথাকথিত ওল্ড টেস্টামেন্ট রাজ্য পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে বদ্ধপরিকর। একদিকে আরব বেদুইনদের অদম্য সাহস, একগুঁয়েমি এবং ধর্মীয় উন্মাদনা, অন্যদিকে ইহুদিবাদীদের আত্মম্ভরিতা, সামরিক শক্তি এবং যুদ্ধংদেহী মনোভাব একে অন্যকে কয়েক দশক ধরে শত্রু ভাবাপন্ন করে রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঙ্কেল স্যামের সক্রিয় সমর্থন, যা ইসরায়েলকে ক্রমেই ঠেলে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম আধিপত্যের বিপ্রতীপে।
এভাবে ইসরায়েল ফিলিস্তিন সমস্যা একটি অসম্ভব জটিল সমস্যা হিসেবে থিতু হতে থাকে, যার স্থায় সমাধান সুদূরপ্রসারী।
এই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন রক্তপাত আর কতদিন চলবে? বাবরি মসজিদ এবং রাম মন্দির নিয়ে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ মোটামুটি নিষ্পত্তি হয়েছে। পর্যায়ক্রমিক আলাপ-আলোচনা এবং চুক্তির পর মিশর ইসরায়েলের কাছ থেকে ১৯৭৯ সালে সিনাই উপত্যকা ফিরে পেয়েছে।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বৈরিতা এ ধরনের পারস্পরিক মীমাংসা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কিন্তু সেজন্যে একে অপরকে বুঝতে হবে, সমঝোতার মনোভাব নিয়ে সংকট নিরসনে আগ্রহী হতে হবে, যা অসলো চুক্তিতে (১৯৯৩-১৯৯৫) বিধৃত হয়েছিলো। হতাশাজনক ব্যর্থতা সত্ত্বেও, ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের মধ্যে এ পর্যন্ত সম্পাদিত চুক্তিগুলি অবশ্যই পারস্পরিক সহনশীলতার জন্য সামান্য পথ প্রশস্ত করেছে, যা এই সন্ধিক্ষণে ইতিবাচক মনে করা যেতে পারে।
উভয়ের উচিত রক্ষণশীল মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করা। সাড়ে সাত দশক এই উপলব্ধির জন্য যথেষ্ট যে, তাদের কেউই অন্যকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে পারবে না এবং আধিপত্যবাদ এবং সন্ত্রাসবাদ থেকে ভালো কিছু পাওয়া যায় না। ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরাইলের আইজাক রবিন ( ১৯৯২-১০৯৫) এবং শিমন পেরেস অসলো চুক্তি তৈরিতে ভূমিকার জন্য যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার (১৯৯৪) পান।
তারা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়ার উন্নয়নে অনেক অবদান রেখেছিলেন। তাদের অনুসারীদের উচিত শান্তি আন্দোলনের চেতনাকে সমুন্নত রাখা। বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি এখন সংঘাতের প্রকোপে অসুস্থ এবং ক্লান্ত, এবং বিভিন্ন উপায়ে, দ্বি-জাতি সমাধান-এর দিকে যেতে তাদের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। তাই নেতানিয়াহু এবং হামাসের এই পারস্পরিকতা ও সমতার দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত।
ইসরায়েলকে তার জাতিগত অহমিকা, আধিপত্যবাদী নীতি এবং নরহত্যা যজ্ঞ এবং হামাসকে তার জঙ্গিবাদী মানস থেকে মুক্ত হতে হবে। অন্যদিকে, বছরের পর বছর ধরে চলা আন্তঃদলীয় দ্বন্দ্ব ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রনির্মাণের আন্দোলনকে ম্লান করে দিয়েছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে এবং সাধারণভাবে আরব বিশ্বের মধ্যে ইস্পাত কঠিন ঐক্য থাকতে হবে।
জাতিসংঘের সদস্যপদ পাওয়ার জন্য ফিলিস্তিনিদের আবেদনের বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে নেয়া হয়েছিল। মিডল ইস্ট কোয়ার্টেট – জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া আহ্বান জানিয়েছে যে ইসরায়েলি এবং ফিলিস্তিনি পক্ষের একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে নতুন শান্তি আলোচনার জন্য মিলিত হওয়া উচিত। কিন্তু এই সব উদ্যোগ আমাদের জন্যে খুব একটা আশাপ্রদ হতে পারেনি।
সমস্ত আলোচনা প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করে, নেতানিয়াহু নিরীহ ফিলিস্তিনিদের পঙ্গু ও হত্যা করার জন্য অপারেশন প্রোটেক্টিভ এজ নামে তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছেন । পরপর দুটি মহাযুদ্ধে জার্মানি ছিল খলনায়ক। ইসরায়েল কি তবে তৃতীয়টিতে ভিলেন হতে চলেছে?
বাংলাদেশ তার জন্মের পর থেকেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সমর্থক। কিংবদন্তি ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে বাংলাদেশের আজীবন বন্ধুত্ব ছিল। তিনি ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় আরব দেশগুলির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন ঘোষণা করেছিলেন এবং তাদের কাছে মেডিকেল টিম প্রেরণ করেছিলেন। বাংলাদেশের মানুষও তাদের পাশে আছে।
লাখ লাখ বাংলাদেশি যারা মানুষ ইহুদি নেকড়েদের ভর্ৎসনা করছে এবং প্রতিরোধকারী ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের উৎসাহ দিচ্ছে। ফিলিস্তিনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঢাকার রাস্তায় লাখো মানুষ নেমে যে সংহতি ও প্রতিবাদ জানালো- তা থেকে নিশ্চয়ই শক্তিশালী বার্তা পেলো বিশ্ববাসী। যা থেকে শিক্ষা নিতে পারে মুখবুজে থাকা ৫৭টি ইসলামী রাষ্ট্র, আরবলীগ ও ওআইসির বিশ্ব নেতারা।







