বাংলাদেশে যুদ্ধ সক্ষমতা সম্পন্ন জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক-৩ ফাইটার জেটের সিমুলেটর হস্তান্তরকে দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এটি কেবল দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয় নয়; বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
সংবাদমাধ্যম ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, কোনো দেশ সাধারণত যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে না পৌঁছালে আগাম প্রশিক্ষণ অবকাঠামো তৈরি করে না। ফলে বাংলাদেশে জেএফ-১৭ ব্লক-৩ সিমুলেটর পাঠানোকে সম্ভাব্য যুদ্ধবিমান চুক্তির প্রস্তুতিমূলক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সম্পর্কের এই নতুন গতি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশ বদলাচ্ছে এবং বঙ্গোপসাগর ঘিরে সামরিক প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
ঢাকা সফরে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল
২০২৬ সালের মে মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের বিমানবাহিনীর প্রথম আনুষ্ঠানিক এয়ার স্টাফ বৈঠকে পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন এয়ার ভাইস মার্শাল আওরঙ্গজেব আহমেদ। তিনি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর অপারেশনাল ডেপুটি চিফ অব এয়ার স্টাফ, স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের কমান্ডার এবং ডিজি পিআর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন এয়ার কমোডর শাহ খালিদ, আবদুল গফুর বাজদুর, গ্রুপ ক্যাপ্টেন মাহমুদ আলী খান এবং উইং কমান্ডার হাসান তারিক আজিজ। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিনিধি দলের গঠন থেকেই বোঝা যায় সফরটির লক্ষ্য ছিল কৌশলগত ও অপারেশনাল সমন্বয়, শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা নয়।
বৈঠকে পাকিস্তান বিমানবাহিনী জেএফ-১৭ ব্লক-৩ এর বহুমুখী যুদ্ধ সক্ষমতার বিষয়টি তুলে ধরে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে ফরাসি রাফাল যুদ্ধবিমানের সঙ্গে তুলনামূলক সক্ষমতার বিষয়ও আলোচনায় আসে বলে জানা গেছে।
যুদ্ধবিমান আসার আগেই প্রশিক্ষণ অবকাঠামো
পাকিস্তান বাংলাদেশকে যে জেএফ-১৭ ব্লক-৩ সিমুলেটর দিয়েছে, সেটি শুধুমাত্র প্রাথমিক প্রশিক্ষণের জন্য নয়; বরং পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ প্রস্তুতি, কৌশলগত মহড়া এবং মিশন অনুশীলনের উপযোগী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধবিমান পরিচালনায় পাইলট রূপান্তর প্রশিক্ষণ সবচেয়ে সময়সাপেক্ষ ধাপগুলোর একটি। আগাম সিমুলেটর ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পাইলটরা যুদ্ধবিমানের অপারেশনাল কাঠামো সম্পর্কে আগেই ধারণা পেতে পারেন। এতে যুদ্ধবিমান হাতে পাওয়ার পর স্কোয়াড্রন সক্রিয় করতে সময় কম লাগে।
একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীরাও বিমানটির প্রযুক্তিগত কাঠামো সম্পর্কে ধারণা অর্জনের সুযোগ পান, যা বহরে নতুন যুদ্ধবিমান যুক্ত করার প্রক্রিয়া সহজ করে।
উন্নত যুদ্ধ প্রশিক্ষণের প্রস্তাব
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান সারগোধার মুশাফ এয়ার বেস এবং কামরার পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি পাইলটদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রস্তাব দিয়েছে।
এই প্রশিক্ষণে বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ (বিভিআর) যুদ্ধ কৌশল, সুপারসনিক ইন্টারসেপশন, মাল্টিরোল স্ট্রাইক সমন্বয় এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার টিকে থাকার কৌশল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (এইএসএ) রাডার পরিচালনা, অ্যাভিওনিকস সিস্টেম, ইঞ্জিন সাপোর্ট এবং সামুদ্রিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিষয় ইঙ্গিত দেয় যে আলোচনাটি কেবল যুদ্ধবিমান কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অপারেশনাল ইকোসিস্টেম তৈরির পরিকল্পনা চলছে।
ধাপে ধাপে চূড়ান্ত চুক্তির দিকে অগ্রগতি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সামরিক যোগাযোগ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। দুবাই এয়ারশোতে পাকিস্তান একটি ‘বন্ধুসুলভ রাষ্ট্রের’ সঙ্গে সমঝোতার কথা জানানোর পর থেকেই ধারণা জোরালো হয় যে বাংলাদেশ জেএফ-১৭ ব্লক-৩ কেনায় আগ্রহী।
পরে বাংলাদেশি পাইলট ও প্রযুক্তিবিদদের পাকিস্তানে প্রশিক্ষণ সফরের খবরও সামনে আসে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবর সিধু এবং বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের বৈঠকেও সম্ভাব্য জেএফ-১৭ ক্রয় নিয়ে আলোচনা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৪৮টি জেএফ-১৭ ব্লক-৩ যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা করছে। প্রথম ধাপে ১৬টি যুদ্ধবিমান, অস্ত্র ব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ অবকাঠামো এবং সহায়ক সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
সম্ভাব্য এই চুক্তির আর্থিক মূল্য প্রায় ৭২ কোটি মার্কিন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আধুনিকায়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ কর্মসূচির আওতায় পুরোনো মিগ-২৯ ও এফ-৭ যুদ্ধবিমান প্রতিস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
জেএফ-১৭ ব্লক-৩ কে তুলনামূলক কম ব্যয়ে ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে এইএসএ রাডার, আধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং ডব্লিউএস-১৩ই ইঞ্জিন ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া এতে দীর্ঘপাল্লার পিএল-১৫ বিভিআর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যা আধুনিক আকাশযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হয়।
সামুদ্রিক হামলা পরিচালনার সক্ষমতাও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জেএফ-১৭ ব্লক-৩ এর সঙ্গে রাফালের তুলনা টানার বিষয়টি শুধু বিপণন কৌশল নয়; বরং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের উদ্দেশে কৌশলগত বার্তাও বহন করে।
তাদের মতে, বাংলাদেশ যদি জেএফ-১৭ বহরে যুক্ত করে, তবে তা শুধু বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ঘোষণা হয়নি। ফলে যুদ্ধবিমান কেনার সময়সূচি, সংখ্যা ও আর্থিক কাঠামো নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তারপরও সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সিমুলেটর হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ কাঠামো এবং উচ্চপর্যায়ের প্রতিরক্ষা যোগাযোগ সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ভবিষ্যৎ আকাশশক্তি সহযোগিতার স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে।








