১৯২১ সালের ১ জুলাই রমনার সবুজ চত্বরে যে শিক্ষায়তনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল পূর্ববঙ্গের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আত্মবিকাশ, স্বাধিকার আন্দোলন এবং সর্বোপরি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান মননচর্চার কেন্দ্র। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়টি নেতৃত্ব দিয়েছে। এ কারণেই বলা হয়, বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
কিন্তু শতবর্ষ অতিক্রম করার পর আজ যখন আমরা এই বিদ্যাপীঠের দিকে তাকাই, তখন গৌরবের চেয়ে গ্লানি এবং অর্জনের চেয়ে অবক্ষয়ের চিত্রই বেশি দৃশ্যমান হয়। সম্প্রতি বরেণ্য সাংবাদিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী জাহিদ নেওয়াজ খানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরের ক্ষতকে নির্মমভাবে উন্মোচিত করেছে। তাঁর সেই গভীর পর্যবেক্ষণ এবং বর্তমান বাস্তবতার আলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ঐতিহ্য, বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে উঠেছে।

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতির মনন গঠনে অবদান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে ছিল এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাস। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ১৯১১ সালে রদ হওয়ার পর পূর্ববঙ্গের মানুষের ক্ষোভ প্রশমনে ব্রিটিশ সরকার এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। লর্ড কার্জনের নামাঙ্কিত কার্জন হল কিংবা ঢাকা হলের (বর্তমান ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল) লাল ইটের দালানগুলো শুধু স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন ছিল না; এগুলো ছিল জ্ঞানচর্চার নতুন এক দিগন্তের সূচক।
শুরুর দিকে স্যার পি. সি. রায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো বিশ্বমানের পণ্ডিতদের পদচারণায় মুখরিত ছিল এই ক্যাম্পাস। সত্যেন্দ্রনাথ বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অবস্থায় কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্টিক্স-সংক্রান্ত যুগান্তকারী গবেষণা সম্পন্ন করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
কেবল বিজ্ঞান বা কলাবিদ্যার চর্চায় নয়, বিশ্ববিদ্যালয়টি কাজ করেছে মুক্তবুদ্ধি চর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে। কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল হুসেনদের ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এবং ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ এই চত্বর থেকেই সমাজকে কুসংস্কারমুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছিল। পরবর্তীকালে পাকিস্তান আমলে যখনই বাঙালির সংস্কৃতি ও অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রথম আক্রমণের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর প্রথিতযশা শিক্ষকেরা। গণহত্যার শিকার হয়েও এই বিশ্ববিদ্যালয় দমে যায়নি; বরং স্বাধীনতার সংগ্রামে অনুপ্রেরণার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশেও দেশের শীর্ষস্থানীয় আমলা, রাজনীতিবিদ, গবেষক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী।
রাজনীতি চর্চার অপব্যবহার ও মুক্তবুদ্ধির পথ রুদ্ধ হওয়া
যে রাজনীতি একসময় দেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল, কালক্রমে সেই রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপই বিশ্ববিদ্যালয়টির স্বাধীন বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষক রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন অথবা বলা ভালো, অবক্ষয় বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটি জ্ঞান উৎপাদন কেন্দ্র থেকে অনেকাংশে দলীয় প্রভাববলয়ের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে অনেক সময় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘নীল’ ও ‘সাদা’ দলের মেরুকরণে যোগ্য অনেক শিক্ষক পিছিয়ে পড়েন, আর রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠিত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট থেকে শুরু করে ডিন ও হল প্রাধ্যক্ষের পদ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব দেখা যায়। ফলে শিক্ষকদের একটি অংশের মনোযোগ গবেষণা ও পাঠদানের চেয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতার বলয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে।
এই সংস্কৃতির সরাসরি প্রভাব পড়ে মুক্তবুদ্ধি চর্চার ওপর। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চরিত্র হওয়ার কথা ছিল প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মুক্ত বিতর্কের পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু দলীয় বিভাজন ও প্রভাব বিস্তারের সংস্কৃতি অনেক সময় ভিন্নমতের কণ্ঠস্বরকে দুর্বল করে দেয়। হলের গণরুম, গেস্টরুম নির্যাতন এবং সিট বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নিজেদের স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে নিরুৎসাহিত হয়।
‘ওয়ান জেনারেশন ইউনিভার্সিটি’ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া
বিশিষ্ট সাংবাদিক জাহিদ নেওয়াজ খান তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন কেন অনেক সাবেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী (এক্স-ডিইউয়ান) তাঁদের সন্তানদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহী নন কিংবা সেভাবে প্রস্তুত করছেন না? গত তিন দশকে কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার বহু সাবেক শিক্ষার্থীর কাছে ‘ওয়ান জেনারেশন ইউনিভার্সিটি’তে পরিণত হয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
এই পর্যবেক্ষণটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান বাস্তবতার ওপর একটি শক্তিশালী প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়। যাঁরা নিজেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তাঁদের একটি অংশ কেন নিজেদের সন্তানদের এই প্রতিষ্ঠানে দেখতে চান না? এর উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে ক্যাম্পাসের অনিরাপদ পরিবেশ, সেশনজট, আবাসনসংকট এবং সর্বোপরি শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগের বিষয়গুলো।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার অবস্থান শক্তিশালীভাবে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংগুলোতেও বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান আশানুরূপ নয়।
জাহিদ নেওয়াজ খানের ভাষায়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মতো প্রতিষ্ঠানে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর হার তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই হার অনেক কম। তাঁর মতে, মেধাবী শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে বিসিএস বা সরকারি চাকরি।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং গবেষণার মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক শিক্ষার্থী প্রথম বর্ষ থেকেই বিষয়ভিত্তিক গভীর অধ্যয়ন ও গবেষণার পরিবর্তে চাকরিমুখী প্রস্তুতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। কারণ তাঁদের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, গবেষণা বা একাডেমিক উৎকর্ষের তুলনায় সরকারি চাকরি অধিক নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ।
ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ধীরে ধীরে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র থেকে চাকরিমুখী প্রস্তুতির প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় তার গবেষণাভিত্তিক ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা হারাতে পারে।
ঐতিহ্য হারানোর কারণ ও গবেষণার দৈন্যদশা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যগত অবস্থান দুর্বল হওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করা যায়।
শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি
মেধা, গবেষণা ও শিক্ষাদানের দক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় বা আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে মানসম্মত গবেষণা কমে যায় এবং চাটুকারিতাভিত্তিক সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়।
গবেষণায় অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ
বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি হলো গবেষণায় ব্যাপক বিনিয়োগ। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণা খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে মৌলিক গবেষণা, উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক মানের আবিষ্কার প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না।

আবাসনসংকট ও হল-রাজনীতি
হলগুলোতে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রভাব, সিট বাণিজ্য এবং ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় এবং স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়।
যুগোপযোগী কারিকুলামের অভাব
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, বায়োটেকনোলজি ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পাঠ্যক্রম সেই পরিবর্তনের সঙ্গে পর্যাপ্তভাবে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে।
উচ্চশিক্ষা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব
সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বাকযুদ্ধ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কেউ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কোচিং সেন্টার’ বলে আখ্যা দেন, আবার কেউ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব বা মান নিয়েই প্রশ্ন তোলেন।
বাস্তবতা হলো, এ ধরনের দ্বন্দ্ব দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কোনো উপকার করে না। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ই দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী আজ ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও বিশ্বের অন্যান্য দেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। একইসঙ্গে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও গবেষণা, প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ সীমিত। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই একে অপরকে হেয় করার পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানোন্নয়নের প্রতিযোগিতা বেশি প্রয়োজন।
সহযোগিতার সংকট ও সামাজিক বাস্তবতা
একসময় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে ন্যাটোর মহাসচিব পিটার ক্যারিংটনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশ কেন প্রত্যাশিত গতিতে এগোতে পারেনি। তিনি দুটি কারণ উল্লেখ করেছিলেন:
১. ক্ষমতা ভাগাভাগি করার সংস্কৃতির অভাব।
২. একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতার ঘাটতি।
এই পর্যবেক্ষণ পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে বাংলাদেশের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতায় এর কিছু প্রতিফলন দেখা যায়। আমরা অনেক সময় সহযোগিতার চেয়ে প্রতিযোগিতা, সহাবস্থানের চেয়ে বিভাজন এবং সমন্বয়ের চেয়ে দ্বন্দ্বকে বেশি গুরুত্ব দিই।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও অনেক সময় উৎপাদনশীল গবেষণা, উদ্ভাবন বা শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের চেয়ে প্রতীকী ও আবেগনির্ভর বিষয় নিয়ে বেশি বিতর্ক দেখা যায়। ফলে প্রকৃত জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখনো অনেক শিক্ষক নীরবে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে গবেষণা ও শিক্ষাদানে অবদান রেখে চলেছেন। কিন্তু সামগ্রিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁদের সেই প্রচেষ্টা কাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি পায় না।

ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার উপায় ও মুক্তবুদ্ধির পথ উন্মুক্ত করা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে হয়, তবে কেবল কাঠামোগত নয়; একইসঙ্গে মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় প্রভাব ও সংকীর্ণ স্বার্থের বাইরে এনে একাডেমিক উৎকর্ষের কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষক নিয়োগ
শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও একাডেমিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষণা প্রকাশনা, পিএইচডি ডিগ্রি, শিক্ষাদানের দক্ষতা এবং গবেষণার প্রভাবকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় আনুগত্য যেন কোনোভাবেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব না ফেলে তা নিশ্চিত করা জরুরি।
লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির অবসান
ক্যাম্পাসে দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে নিয়মিত ও অংশগ্রহণমূলক ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব, বিতর্ক ও দায়িত্বশীলতার চর্চার সুযোগ পাবে।

গবেষণায় জাতীয় বাজেট বৃদ্ধি
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য জাতীয় বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বরাদ্দ করা উচিত। শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে শুধু চাকরির মেয়াদ নয়, বরং গবেষণার গুণগত মান, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা এবং উদ্ভাবনী অবদানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। গবেষণা-ভিত্তিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও আবাসন সংস্কার
বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণভাবে প্রশাসনের অধীনে থাকতে হবে। কোনো ছাত্রসংগঠন যেন আবাসন, সিট বণ্টন বা হল প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে তা নিশ্চিত করা জরুরি। গণরুম, গেস্টরুম নির্যাতন এবং সিট বাণিজ্যের মতো অমানবিক সংস্কৃতি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, ন্যায়সঙ্গত ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
সহযোগিতামূলক উচ্চশিক্ষা মডেল
সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ গবেষণা প্রকল্প এবং ক্রেডিট ট্রান্সফার সিস্টেম চালুর মাধ্যমে একটি সমন্বিত উচ্চশিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ একাডেমিক ঐতিহ্য এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আধুনিক অবকাঠামো ও বৈশ্বিক সংযোগ এই দুইয়ের সমন্বয় দেশের উচ্চশিক্ষাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

পাঠ্যক্রম সংস্কার ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষাকে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞাননির্ভর না রেখে বাস্তব দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। ক্রিটিক্যাল থিংকিং, ডেটা সায়েন্স, প্রযুক্তি, নেতৃত্ব ও সমস্যা সমাধান দক্ষতাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ ও ইন্ডাস্ট্রি সংযোগ বাধ্যতামূলক করা গেলে তারা কেবল সরকারি চাকরিনির্ভর না হয়ে বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতায় সক্ষম হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ ও সহনশীলতা
বিশ্ববিদ্যালয়কে মতবিনিময়, বিতর্ক এবং মুক্ত আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা ছাড়া মুক্তবুদ্ধির চর্চা সম্ভব নয়। নিয়মিত সেমিনার, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় সংলাপ এবং গবেষণা সম্মেলনের মাধ্যমে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ শক্তিশালী করা যেতে পারে।
জাতীয় গবেষণা তহবিল ও মেধা প্রত্যাবর্তন
বিদেশে অবস্থানরত মেধাবী গবেষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে একটি শক্তিশালী জাতীয় গবেষণা তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই তহবিল পরিচালিত হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় অংশ নিতে পারবে।
মানবতার ফেরিওয়ালা ও প্রকৃত জ্ঞানচর্চার সমাজ নির্মাণ
বিশ্ববিদ্যালয় কেবল সার্টিফিকেট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি মানবিক, যুক্তিবাদী এবং দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির কেন্দ্র। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে কেবল চাকরির জন্য প্রস্তুত করে না, বরং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে।
আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু ডিগ্রিধারী নয়, বরং সমাজের কল্যাণে নিবেদিত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে। জ্ঞানচর্চা যদি কেবল চাকরি বা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে যায়, তবে সমাজ তার মানবিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় মুনীর চৌধুরী, মোতাহের হোসেন চৌধুরী ও আরজ আলী মাতুব্বরের মতো মুক্তচিন্তার মানুষের জন্ম দিয়েছে। সেই মুক্তবুদ্ধির ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করাই এখন সময়ের দাবি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিফলন। এই প্রতিষ্ঠান যদি তার ঐতিহ্য ও মর্যাদা হারায়, তবে তা দেশের সামগ্রিক মেধা ও মননের ভবিষ্যতের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হবে।
তবুও আশার জায়গা রয়েছে। প্রয়োজন কেবল সুপরিকল্পিত সংস্কার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং একাডেমিক সততা। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবারও গবেষণা, মুক্তবুদ্ধি ও মানবিকতার কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন এক প্রজন্ম তৈরি করা, যারা কেবল চাকরির জন্য নয়, বরং জ্ঞান, উদ্ভাবন ও মানবতার কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








