প্রথমবার খাবার দাবারে যাই সাগরের সঙ্গে। তখন সেটা খাবার দাবার হয়নি। সাগর তার বন্ধুকে বিরাট একটা সুযোগ করে দেবার জন্য নিয়ে গিয়েছিল তার আব্বার কাছে। আব্বা ফজলুল হক ছিলেন বিখ্যাত মানুষ। এখন যেটা খাবার দাবার, সেখানটাতেই ছিল তাঁর অফিস।
অর্ধেক অফিস, বাকি অর্ধেকটা দেয়াল ঘড়ির প্রদর্শনীকেন্দ্র যেনো। সেখান থেকে কেউ ইচ্ছা করলে ঘড়ি কিনতে পারবে কিন্তু সেটা দোকান বা বিক্রয়কেন্দ্র বলা যাবে না। কেনো না, বিস্তারিত বললে তা জানা হবে। ঠিকানায় ঢুকেই বামে ডানে তাকালে দেয়াল জুড়ে দেয়াল ঘড়িরা টিক টক টিক শব্দ করেই চলেছে। ওরা বলছে, দেখো আমাদের জাত বদলে গেছে। আমরা বাঙালি এখন।
এই বাংলা ঘড়ি তখন বেশ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। সদ্য দেশটা স্বাধীন হয়েছে। মানুষের প্রাণে মনে দেশ, স্বাধীনতা, পতাকা, ভাষা নিয়ে আবেগ থৈথৈ করছে। বন্ধুর পিতা হিসাবে জানতাম না কিন্তু ফজলুল হক নামের সৃজনশীল, অস্থিরচিত্ত মানুষটা সম্পর্কে কৌতূহল তৈরি হয়েছিল বলে তাঁর বিশেষ বিশেষ কিছু সৃজনশীল উদ্যোগের কথা জানতাম।
জিপিওর দিক থেকে গুলিস্তানে যেতে হলে বামে পড়ে বায়তুল মোকাররম। নাক বরাবর সোজা দেখা যায় স্টেডিয়াম। গুলিস্তানে যেতে ডানদিকে মোড় নিতে হয়। মোড় নিয়ে বামে তাকালে ৩২ নং বঙ্গবন্ধু এ্যাভেনিউ। ছয় তলা ভবনের নিচ তলায় এখন দেখা যায় খাবার দাবার।
চুয়াত্তর পঁচাত্তর সালে সেখানে ছিল সাগরের আব্বার অফিস। আমি আর্ট কলেজ থেকে আসি। স্টেডিয়াম গেটের উল্টা দিকে মোড়টায় সাগর অপেক্ষা করবে বলেছিল। সময়মতোই পৌঁছে যাই। সাগর কখনো ঘড়ি পরে না। আমাকে দেখে কব্জি উল্টে ঘড়িতে সময় দেখে। হাসে, সময়মতোই এসেছো।
আমাদের বন্ধুত্ব অনেক পুরানো নয়। পরষ্পরকে একটু একটু করে জানা হচ্ছে তখন। সাগর আমার বড় দোষ সম্পর্কে জেনে গেছে। জেনেছে, সে খুব সময় মেনে চলা মানুষ বলে। হাতে ঘড়ি পরে না যে মানুষ তার পক্ষে সময় মেনে চলা কিভাবে সম্ভব! তা নিয়ে আমরা খুব ভাবি। প্রশ্ন করে জবাব পাই না। মেলে একটা শিশুতোষ হাসি।
অনেকেই অনেকবার হুট করে কটা বাজে প্রশ্ন করে দেখেছি, ঠিক ঠিক বলে দিতে পারে কটা বাজে। কখনো কখনো হয়তো মিনিট পাঁচেক কম বেশি হয়। তাতে বুঝতে পারি, সাগর আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ে অবাক করে দিতে চায় না।
৩২ নং বঙ্গবন্ধু এ্যাভেনিউয়ে সাগরের আব্বার অফিসে ঢুকেছি। পুত্র তার বন্ধুর কৃতিত্ব, গুণপনা সম্পর্কে পিতাকে অবহিত করতে চায়। তার মনে আরো একটা আশা আছে, আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার পর সেটা বলবে। তার বিশ্বাস পুত্রের প্রস্তাব পিতা উড়িয়ে দেবেন না।
দেয়ালে দেয়ালে বাংলা সংখ্যা লেখা ঘড়ি দেখে মনে খটকা লাগে। কাগজে পড়েছিলাম বাংলা ঘড়ি আর ঘড়ির উদ্ভাবকের কথা। আমি সাগরকে প্রশ্ন করি, ফজলুল হক সাহেব তোমার কিছু হন? সাগর হাসে, জানো নাকি তাঁর সম্পর্কে? বললাম, হ্যাঁ জানি তো। আমরা কি তাঁর অফিসে এসেছি, তিনিই কি তোমার আব্বা?
সাগর ঘড়ি ভর্তি দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলে, দেখো এতোগুলো ঘড়ি একসাথে উঁচু গলায় নিচু গলায় নানারকম শব্দ করে যাচ্ছে, আমার শুনতে খুবই ভালো লাগে। ভালো লাগে ঘড়ির ডায়ালে বাংলা সংখ্যাগুলো দেখতে। দেখে মনে হয়, ইংরেজির হাত থেকে ঘড়িরা স্বাধীন হয়ে গেছে।
দেয়ালে দেয়ালে বাংলা ঘড়িরা হাসছে, শব্দ করছে যার যার মতো। যে ঘড়ি শুধু সময় দেখার জন্য কাজে লাগে, বাংলা সংখ্যা বসিয়ে দিয়ে বস্তুটিকে আবেগপূর্ণ করে তোলা হয়েছে।
খুব সাধারণ বিষয় কিন্তু এই সাধারণ বদলের মধ্য দিয়ে বাঙালির মনস্তত্ত্বে ঘি ঢেলে দেয়া হয়েছে। যে ব্যক্তির মাথায় এমন একটা ধারণা সকালের সূর্যের মতো উদয় হয়েছিল, তিনি অবশ্যই অতি বিশেষ একজন মানুষ।
একজন অদেখা মানুষের সৃজনশীলতার শক্তিতে আমি তখন বিস্মিত, মোহিত। বয়স কম। নতুন নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের অতি আগ্রহ মনে। রক্তে উত্তেজনা বেড়েছে, বুকের ধুকপুক শব্দটাও বেড়ে গেছে। ঘড়ি দেখি, ঘুরে সাগরকেও দেখি। বলি, যে জন্য এখানে নিয়ে এসেছো সেটা কার্যকরী না হলেও মনখারাপ নিয়ে ফিরবো না।
মানুষটাকে আমার দেখার সখ ছিলো। স্কুলের ছাত্র থাকতেই মাঝেমাঝে চিত্রালী পড়ার অভ্যাস ছিল। জানতাম এই ফজলুল হক সাহেব পাকিস্তানের প্রথম শিশুদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মান করেছেন। আর একটু পরেই তাঁর সাথে দেখা হবে।
তাঁর কেবিনটা সামনে। সাগর হাসছে, হাসতে হাসতে বলে, আমি গর্বিত তিনি আমার পিতা কিন্তু সময়ের আগেই অনেককিছু ভেবে ফেলতে পারেন বলে অনেককিছু বিশেষ হয়ে ওঠে না।
বলি, যিনি ব্যতিক্রমী ধারণার মানুষ বিশেষ ধারণা তাঁকে উদ্দীপ্ত করবে তারপর তাঁর কৃতিত্ব সামনে এলে কে কতটুকু আনন্দিত, উদ্দীপ্ত, বিস্মিত হবে বা হবে না, প্রকৃত সৃজনশীল মানুষ সেটা নিয়ে অগ্রিম মাথা ঘামাবে না। সৃষ্টিশীল মানুষের দৃষ্টি থাকে শুধু সামনে, সুদূরে। বাম ডানে তাকিয়ে, ভেবে এগোয় সাধারণ।
ঘড়ির বিষয় থেকে সরে সিনেমার কথা তুলি। বলি, চলচ্চিত্র নির্মাতা ফজলুল হক তোমার পিতা আগে কখনোই বলোনি। আমি পত্রিকায় যখন সান অফ পাকিস্তান সম্পর্কে পড়েছি তখন খুবই ভালো লেগেছিল। মানুষ অনেকরকম সিনেমা বানায় কিন্তু ছোটদের জন্য চলচিচিত্র নির্মান করার ইচ্ছা খুব কম মানুষের হয়।
লোকটার বহুরকমের পাগলামো আছে। চলো, কথা হলে বুঝতে পারবে। এগিয়ে যেতে যেতে প্রবেশ দরজার সামনে তিনহাত দূরে দাঁড়িয়ে সাগর বলে, একটু নার্ভাস লাগছে যে জন্য এসেছি তা বলার পর তিনি রাজি হবেন কি না। তবে পুত্রের দাবী নিয়ে নয়, মানুষটার অনেকরকম পাগলামো আছে বলে আশা, তিনি রাজি হয়ে যাবেন।
চলবে…








