বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অনলাইন জুয়া এক বিপজ্জনক আসক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে, বিশেষ করে স্মার্টফোনের মাধ্যমে সহজে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে এতে আশক্ত হচ্ছে তরুণ সমাজ। ধীরে ধীরে এটি ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের কাছে।
আজ (৯ ডিসেম্বর) সোমবার প্রকাশিত সংবাদ মাধ্যম ইউএনবি এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, এই অভ্যাসটি ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে কর্মজীবী পেশাজীবী পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সের এবং সামাজিক অবস্থানের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, তবে এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা এখনও খুবই কম, যা মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাবের মতোই।
যেভাবে ছড়াচ্ছে
রাহাত (নাম পরিবর্তিত), একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সমাপ্ত স্নাতকোত্তর ছাত্র। তার অনলাইন জুয়ার জালে ধরা পড়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন এবং বন্ধুদের মাধ্যমে কয়েকটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম। সহজ অর্থ উপার্জনের প্রস্তাবটি খুবই প্রলোভনীয় ছিল। এখানে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, এমনকি লুডো ও ক্যাসিনো গেমসের মতো ভার্চুয়াল গেমসসহ বিস্তৃত বেটিং অপশন রয়েছে। বিশেষ করে যারা খেলা পছন্দ করেন, তারা মনে করেন যে, তাদের খেলার জ্ঞান থেকে ভবিষ্যৎ অনুমান করা সহজ।
তিনি আরও বলেন, অনলাইন জুয়া আসক্তি সমাজের নানা শ্রেণীতে ছড়িয়ে পড়েছে। যেমন, রিকশাওয়ালা এবং দোকানদারদের মতো দৈনিক আয়ের মানুষরা নিজেদের কঠোর পরিশ্রমের টাকা জুয়া খেলায় হারাচ্ছেন। তারা এক রাতেই আয়ের দ্বিগুণ করার ভ্রমে পড়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবকিছু হারিয়ে ফেলেন।
রাহাত জানান, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো প্রথমে কিছু ছোট বিজয় উপহার দিয়ে ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করে। একবার কেউ আসক্ত হলে, তখন ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে থাকে। তারা নিজেদের হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য আরও টাকা বিনিয়োগ করতে থাকে।
তিনি স্থানীয় এজেন্টদের ভূমিকা উল্লেখ করে বলেন, যারা এই লেনদেন সহজ করতে এবং নতুন ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্মে যোগ দিতে উৎসাহিত করে। এই এজেন্টরা কমিশন পায় এবং সারা দেশে বিভিন্ন কমিউনিটিতে কাজ করে। তারা ব্যবহারকারীদের নিরাপদ লেনদেনের আশ্বাস দেয় এবং অ্যাকাউন্ট সেটআপের পরামর্শও দেয়।

নারীদের দৃষ্টিকোণ
তানিয়া (নাম পরিবর্তিত), একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, অনলাইন জুয়াতে আমি প্রথমে কৌতূহল এবং আর্থিক চাহিদার কারণে আগ্রহী হয়েছিলাম। প্রথম দিকে কিছু ছোট অঙ্কের টাকা জিতেছিলাম, কিন্তু ধীরে ধীরে লোভে পড়ে আরও টাকা জমা দিতে শুরু করি। শেষ পর্যন্ত, প্রায় ৫০ হাজার টাকা হারিয়ে ফেললাম, যার মধ্যে অনেকটাই আমি ধার করে নিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল যেন কুয়ায় পড়ে গেছি।
তানিয়া এখন তার বন্ধুদের এই বিপদ সম্পর্কে সাবধান করেন এবং জানান, মুক্তি পাওয়া কঠিন, তবে সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গি
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বিভাগের ডেপুটি কমিশনার নাজমুল ইসলাম এই পরিস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করে বলেন, অনলাইন জুয়া নিঃসন্দেহে একটি আসক্তি। যদিও পাবলিক গেম্বলিং প্রতিরোধ আইন রয়েছে, তবে তার প্রয়োগ যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। যুবকদের আরও ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে শক্তিশালী আইন এবং সুষ্ঠু কার্যক্রম প্রয়োজন।
সাইবার ক্রাইম ডিভিশনের ডেপুটি কমিশনার শাহজাহান হোসেন একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের কাছে সাইবার জুয়ার বিরুদ্ধে স্পষ্ট কোনো আইন নেই। তবে সরকারের নতুন উদ্যোগের অধীনে এই বিষয়টি মোকাবেলা করা একটি অগ্রাধিকার।
সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড রিসার্চের সহযোগী অধ্যাপক ড. তাওহিদুল হক এই সমস্যা মোকাবেলায় পরিবারের ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করে বলেন, অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে ব্যর্থ হন। যেমন করে তারা মাদকাসক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন, তেমনি তাদের সন্তানের আর্থিক অভ্যাস এবং অনলাইন আচরণ পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
ড. হক আরও বলেন, একটি সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজন, যেখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারী সংস্থা এবং পরিবার সবাই একযোগভাবে কাজ করবে। সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচারাভিযানগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজন
যতটা দ্রুত অনলাইন জুয়া ছড়িয়ে পড়ছে, ততটা দ্রুত এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পরিবার, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং সরকারের সমন্বিত প্রচেষ্টায় সচেতনতা বৃদ্ধি, শক্তিশালী আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক উদ্যোগগুলির মাধ্যমে যুব সমাজকে এই আধুনিক আসক্তির হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব।








