‘এই লোকগুলো কারো সঙ্গে কথা বলতে পারবে না, আর কেউই তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারবে না।’—এই স্তব্ধ করে দেওয়া বাক্য দিয়েই শুরু হয় ‘আ টুয়েলভ ইয়ার নাইট’ ট্রেলার। মুহূর্তেই এক বিভীষিকাময় সুর গেয়ে ওঠে পেছনে, আর ক্যামেরা ধরে কিছু পুরুষকে যাদের মাথায় বস্তা পরানো, অন্ধকারে অচেনা গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে তারা।
বছরটা ১৯৭৩। উরুগুয়ে তখন কঠোর সামরিক শাসনের অধীনে। সেই সময় তিনজন রাজনৈতিক বন্দিকে কঠিন এক নিঃসঙ্গ কারাবাসে পাঠানো হয়—যেখানে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর তারা আলাদা রাখা হয়, যেন ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে তাদের মন ও সত্তা।
এই তিনজনের একজন ছিলেন হোসে ‘পেপে’ মুজিকা। চলচ্চিত্রটি তার এবং তার সাথীদের সেই ১২ বছরের বন্দিজীবনের রুদ্ধশ্বাস, অন্তর্দহনে জর্জরিত, অথচ গভীরভাবে মানবিক এক কাহিনি।
যে হোসে পেপে এক সময় ছিলেন গেরিলা যোদ্ধা—আর বহু বছর পর হয়ে ওঠেন উরুগুয়ের রাষ্ট্রপতি। বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র প্রেসিডেন্ট হিসেবে খ্যাতি ছড়ায় তার। রাষ্ট্রপতির বেতনের ৯০ শতাংশ দান করতেন গরিবদের জন্য। রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি পুরনো ভক্সওয়াগেন গাড়ি চালাতেন এবং একটি ছোট ফার্মে বসবাস করতেন। তার জীবনদর্শন ছিল প্রচণ্ড সাদামাটা!
বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র সেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচিত উরুগুয়ের সাবেক এই রাষ্ট্রপতি নেই। ১৩ মে প্রয়াত হয়েছেন তিনি। তার জীবন, যাপন ও দার্শনিক জীবনধারা নিয়ে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র তৈরি হয়েছে। বিখ্যাত নির্মাতা এমির কুস্তারিকা তাকে নিয়ে ২০১৮ সালে নির্মাণ করেন ‘পেপে মুজিকা: আ সুপ্রিম লাইফ’। যে প্রাণ্যচিত্রটি নেটফ্লিক্সে পাওয়া যাবে।
এই প্রামাণ্যচিত্রে সহজভাবে কুস্তারিকা তুলে ধরেন পেপের জীবন, বিপ্লবী অতীত, রাষ্ট্রপতি হওয়া এবং পরবর্তীতে কৃষক জীবন যাপন। এটি ফিল্ম ক্রিটিকরা বলে থাকেন, ‘একটি অন্তরঙ্গ প্রামাণ্যচিত্র’। এছাড়াও পেপেকে নিয়ে হাইমা পেরেস নির্মাণ করে প্রামাণ্যচিত্র ‘পেপে মুজিকা: লেসন ফ্রম দ্য ফ্লাউয়ারহুড’। এটিতেও পেপের রাজনৈতিক আদর্শ ও তার ব্যক্তিগত সাধাসিধে জীবনের গভীর দর্শনের কথাই উঠে এসেছে।
তবে পেপেকে নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত ও প্রশংসিত মূলত সেই ফিচার ফিল্মটিই, যেটির কথা এই লেখার শুরুতে বলা হয়েছে। অর্থ্যাৎ ‘আ টুয়েলভ ইয়ার নাইট’। আলভারো ব্রেচনার পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি মুজিকার কারাবন্দি জীবনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে তিনি তুপামারো গেরিলা সদস্য হিসেবে ১২ বছর বন্দি ছিলেন। যদিও এটি সরাসরি মুজিকার বায়োপিক নয়, তার জীবনের একটি অধ্যায়কে ভিত্তি করে নির্মিত। তবু বিশ্বজুড়ে এই সিনেমাটি পেপেকে অন্যভাবে পোট্রে করে।

চলচ্চিত্রটি মরিসিও রোসেনকফ ও এলেউতেরিও ফার্নান্দেজ হুইদোব্রোর লেখা ‘মেমোরিয়াস দেল কালাবোজো’ বইয়ের উপর ভিত্তি করে নির্মিত। পরিচালক আলভারো ব্রেচনার এই প্রকল্পে চার বছরের গবেষণা ও ডকুমেন্টেশন করেছেন। তিনি একটি কারাগারের গল্পের বাইরে গিয়ে একটি অস্তিত্বগত যাত্রা উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, যেখানে দর্শকরা বন্দিদের মানসিক সংগ্রাম অনুভব করতে পারেন।
চলচ্চিত্রটির চিত্রগ্রহণ করেছেন কার্লোস কাতালান, সম্পাদনা করেছেন ইরিন ব্লেকুয়া ও নাচো রুইজ কাপিলাস, এবং সংগীত পরিচালনা করেছেন ফেদেরিকো জুসিদ। নেটফ্লিক্সে স্ট্রিমিংয়ের পর দর্শকপ্রিয়তার পাশাপাশি এটি ভেনিস, বার্লিন, সান সেবাস্তিয়ানসহ বহু চলচ্চিত্র ইত্যাদি। -দ্য নিউজমিনিট








