বিনোদন

নো আদার ল্যান্ড, নো আদার ট্রুথ

ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের ধ্বংসাবশেষের পাশে শিশু বসে আছেন. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

একজন শিশু লাল পোশাক পরে ধ্বংসাবশেষের পাশে বসে আছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা দেখানো হয়েছে।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ

চলতি মাসেই অস্কারে ‘সেরা ডকুমেন্টারি পুরস্কার ২০২৫’ জিতে নিয়েছে ‘নো আদার ল্যান্ড’— যা ফিলিস্তিনিদের নিজ সম্প্রদায় রক্ষার সংগ্রামের গল্প নিয়ে নির্মিত। ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি নির্মাতাদের যৌথ এই নির্মাণ উদ্যোগ পুরো বিশ্বে হয়েছে প্রশংসিত। গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নিয়ে নিজ শহরের ধ্বংসযজ্ঞের তথ্যচিত্র তৈরি করেন ফিলিস্তিনি তরুণ বাসেল আদরা। যার গল্প বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিতে সহায়তা করেন আরেক তরুণ ইহুদি ইসরায়েলি সাংবাদিক! যার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠে বাসেলের। তাদের এমন যৌথ নির্মাণ ফিলিস্তিনিদের দুঃখ-দুর্দশা ও প্রতিরোধের বার্তা অস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসরে তুলে ধরায় যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি ইসরায়েলপন্থীরা করেছেন নিন্দা। অস্কার পাওয়ায় তীব্র সমালোচনা পেতে হয়েছে ইসরায়েল সরকারের তরফে।

‘নো আদার ল্যান্ড’ ডকুফিল্মটি নিয়ে সম্প্রতি আরব নিউজে ‘নো আদার ল্যান্ড, নো আদার ট্রুথ’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছেন ইওসি মেকেলবার্গ। যিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এবং চ্যাথাম হাউসের ‘মীনা প্রোগ্রাম’ (MEENA) এর সহযোগী গবেষক। তিনি আন্তর্জাতিক প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের নিয়মিত লেখক ও বিশ্লেষক। তার কলামটি চ্যানেল আই অনলাইনের পাঠকদের জন্য ভাষান্তরিত করা হলো-

তখন অস্কার বা একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস-এর মাত্র ২৫তম আসর। সেই সময়ে প্রথমবারের মতো ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্রের জন্য একটি বিভাগ যুক্ত করা হয়েছিল। এরপরের ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে, এই পুরস্কার বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয় তুলে ধরার ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা পালন করে আসছে এবং সেগুলোকে বৃহত্তর জনগণের দৃষ্টিতে আনতে সহায়তা করছে।

এই বছরের সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত ডকুমেন্টারির মধ্যে ছিল “ব্ল্যাক বক্স ডায়েরিস’, যা যৌন সহিংসতা নিয়ে নির্মিত, এবং “পোর্সলেন ওয়ারস’, যা ইউক্রেনীয় শিল্পীদের রাশিয়ার আগ্রাসনের মধ্যে টিকে থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। তবে, অ্যাকাডেমি সদস্যরা বিজয়ী হিসেবে বেছে নিয়েছেন ‘নো আদার ল্যান্ড’কে। এটি এমন একটি চলচ্চিত্র যা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দিকগুলো তুলে ধরে। চারজন ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি কর্মী—বাসেল আদরা, হামদান বল্লাল, ইউভাল আব্রাহাম এবং রাহেল সজোর— এটি নির্মাণের সাথে জড়িত।

অস্কার ২০২৩ এ ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
অস্কারের মঞ্চে নির্মাতারা

অ্যাকাডেমির সদস্যরা এটি বেছে নিয়েছেন শুধুমাত্র বিতর্ক এড়ানোর জন্য নয়, বরং তারা জানতেন যে এটি বিতর্ক সৃষ্টি করবে—এবং সেটি যথাযথ কারণেই।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ইতিহাসে ১৯৪৮ সালের পর সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতার সময়ে এই চলচ্চিত্রটি ফিলিস্তিনের মাসাফের ইয়াত্তা অঞ্চলে ঘটে চলা একের পর এক উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার উপর আলোকপাত করেছে। পশ্চিম তীরের দক্ষিণ হেব্রন পাহাড়ের এই অঞ্চলটিতে প্রায় ২,৮০০ বাসিন্দার বসবাস। এটি ফিলিস্তিনের সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রতিরক্ষাহীন সম্প্রদায়গুলোর একটি, যারা দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

ফিল্মটি কী দেখিয়েছে? ইসরায়েলি দখলদারিত্ব কতটা নিপীড়নমূলক, নির্মম এবং স্বেচ্ছাচারী—এটি চলচ্চিত্রটিতে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সেখানে ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকার খর্ব করা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি কেবলমাত্র ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য করা হয়—কে আসল ভূমির মালিক, সেটি বোঝাতে! জোরপূর্বক সেটি করে থাকেন ইসরায়েলিরা।

‘নো আদার ল্যান্ড’-এর দৃশ্যে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল-এর দুই তরুণ নির্মাতা

মাসাফের ইয়াত্তার ইতিহাস ১৯৮০-এর দশকে ফিরে যায়, যখন ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এটি ‘ফায়ারিং জোন ৯১৮’ ঘোষণা করে এবং সামরিক এলাকা হিসেবে ফিলিস্তিনের এই ভূমিকে তালিকাভুক্ত করে। এরপর থেকেই, সেখানকার বাসিন্দারা উচ্ছেদের হুমকির মুখে রয়েছেন। ইতোমধ্যে খিরবেত সারুরা ও খারুবে নামের দুটি গ্রাম সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, কারণ তাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলিরা।

ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি আইনি ব্যবস্থার আশ্রয় নিলেও, তা সাধারণত দখলদারদের পক্ষেই রায় দেয়। ফলে, ধ্বংসযজ্ঞ চলতেই থাকে। ফিল্মটি এটিও সুস্পষ্টভাবেই তুলে ধরা হয়েছে।

প্রাকৃতিক পরিবেশে আহত ব্যক্তি পড়ে আছেন, পাশে একটি মোবাইল ফোন রয়েছে. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
‘নো আদার ল্যান্ড’-এর দৃশ্যে বাসেল

মাত্র গত মাসেই, ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা B’Tselem জানায় যে, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী সাতটি পরিবারকে গৃহহীন করেছে, তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করেছে, পাশাপাশি চারটি গুহা, দুটি পানি সংরক্ষণাগার, দুটি পানির ট্যাংক ও তিনটি সৌর প্যানেল ধ্বংস করা হয়েছে। এই বাস্তবতাকেই ‘নো আদার ল্যান্ড’-এ চার বছর ধরে (২০১৯-২০২৩) তুলে ধরেছেন বাসেল আদরারা। ছবিটির অন্যতম শক্তি হলো, এটি দর্শকদের নিজেদেরকেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেয়—তারা কোন অবস্থান নেবে, সেটি দর্শকের উপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

শিশু যুদ্ধযান দেখছে, যুদ্ধের দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ এই চলচ্চিত্রটি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে চায় না, বা কোনো রাজনৈতিক সমাধানও দেয় না। বরং, এটি দেখায় কীভাবে দখলদারিত্ব দখলদারকে নৈতিকভাবে দূষিত করে এবং নির্যাতিত জনগণের প্রতি নির্মম করে তোলে—এমনকি তাদেরকে মানুষ হিসেবেও নূন্যতম গণ্য করতে দেখা যায় না।

“যখন তারা ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে, তখন তারা মানুষকে গৃহহীন করে। যখন তারা স্কুল ধ্বংস করে, তখন শিশুদের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেয়। যখন তারা খেলার মাঠ গুঁড়িয়ে দেয়, তখন শিশুদের ছোট ছোট আনন্দও মুছে যায়।” ফিল্মটিতে এমন ভিজ্যুয়াল দর্শককে ভাবতে বাধ্য করবে, এবং ইসরায়েলি দখলদারদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও সহায়তা করবে।

অথচ ইসরায়েলি বেসামরিক প্রশাসন ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই সমস্যার মানবিক সমাধান খুঁজতে পারত, যদি তারা সত্যিই এই মানুষগুলোর কল্যাণ চাইত। সেটা না করে বরং দিনকে দিন তারা তীব্র অমানবিকতার পথ বেছে নিয়েছে।

প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট গৃহাবলী, পাহাড়ি এলাকা, বাংলাদেশ. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ এই চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে দুই বিপরীত মেরুর সমালোচনা এসেছে—যা একইভাবে বিভ্রান্তিকর, যদিও একটির প্রতিক্রিয়া বিশেষভাবে বিস্ময়কর।

প্রথমত, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এবং ডানপন্থী রাজনীতিবিদরা অস্কার পাওয়া ‘নো আদার ল্যান্ড’ চলচ্চিত্রটির নিন্দা জানিয়েছেন। এক ইসরায়েলি কূটনীতিক মন্তব্য করেন, “শিল্প ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আড়ালে ইসরায়েল-বিরোধী ও ইহুদিবিদ্বেষী প্রচারণাকে প্রশংসা করা হচ্ছে।” ইসরায়েলের সংস্কৃতি মন্ত্রী মিকি জোহর বলেন, “ইসরায়েলের মানহানিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির হাতিয়ার বানানো শিল্প নয়, বরং এটি রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড।”

তবে, এই চলচ্চিত্রটি ইসরায়েল-বিরোধী বা ইহুদিবিদ্বেষী নয়। এটি কেবল ইসরায়েলি সমাজের সামনে এক ফিলিস্তিনি তরুণ একটি আয়না ধরে রেখেছে, যেখানে দেখানো হয়েছে তাদের নামেই পশ্চিম তীরে কী ঘটছে!

পুরুষ ব্যক্তি ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার জন্য প্রস্তুত. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
হ্যান্ডিক্যাম দিয়ে শুটি করছেন ফিলিস্তিনি তরুণ বাসেল

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট ও স্যাংশনস (BDS) আন্দোলন-ও এই চলচ্চিত্রের সমালোচনা করেছে। তাদের মতে, এটি “BDS আন্দোলনের অ্যান্টি-নরমালাইজেশন নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে”—যা ট্র্যাজিকভাবে রক্ষণশীল ও ক্ষতিকর মনোভাবের প্রতিফলন।

তবে, এই চলচ্চিত্রের লক্ষ্য অধিকৃত জনগণের দুঃসহ জীবনযাত্রার বিরোধিতা করা এবং বিশ্বজুড়ে দর্শকদের সামনে এই বাস্তবতা তুলে ধরা। এটি নরমালাইজেশন নয়, বরং দখলদারিত্বের স্বীকৃতিকে চ্যালেঞ্জ করা।

পরিশেষে বলা যায়, যারা বিশ্বাস করেন যে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিরা একদিন শান্তিতে সহাবস্থান করবে এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বসবাস করবে, তারা এই ধরনের যৌথ উদ্যোগ দেখে আশাবাদী হতে পারেন। –আরব নিউজ

বিষয়:অস্কারঅস্কার ২০২৫একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসডকুফিল্মসিনেমা

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…