হলি আর্টিজান হামলার বর্ষপূর্তিতে ঢাকার পুলিশ কমিশনারের ‘দেশে কোন জঙ্গি নাই’ বক্তব্যের একদিন পর অতিরিক্ত কমিশনারও বললেন, অপরাধ অপরাধই, এটাকে কোন ‘লেবাস’ দিয়ে ‘কালারিং করার’ প্রয়োজন নাই।
বৃহস্পতিবার ঢাকার হোসাইনী দালানে আসন্ন আশুরা উপলক্ষ্যে গৃহিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে জানাতে আয়োজিত পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে প্রসঙ্গতই আলোচনায় আসে ১০ বছর আগে সেখানেই ঘটে যাওয়া বোমা হামলার ঘটনাটি।
তখনকার হামলা এবং ডিএমপি কমিশনারের দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশনস্) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “অপরাধ অপরাধই। এইটা জঙ্গি, এইটা-ওইটা নিয়ে ইয়ে করার দরকার নাই। একটা বোমা মারবে, মানুষ মরবে এইটা অপরাধ।
“এইটা ক্রাইম, ক্রাইমের বিচার প্রচলিত আইনে যেভাবে আছে সেভাবেই হবে, ঠিক আছে? আপনি এইটাকে কোন লেবাস দিয়ে ওইটাকে কালারিং করার কোন প্রয়োজন নাই, আমি মনে করি না। অপরাধ, অপরাধই। সে যে আমলেই হোক, যেভাবেই হোক। আমরা এইটা ওয়াকিবহাল আছি, আমাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা আছে।”
ককটেল বিস্ফোরণ ‘অস্বাভাবিক না’
সম্প্রতি বিভিন্নস্থানে ককটেল বিস্ফোরণের বিষয়টি নজরে আনলে অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশনস্) এস এন মো. নজরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “আপনারা জানেন, রাজনৈতিক একটা প্রেক্ষাপট চেইঞ্জ হইছে। বিচার শুরু হইছে, অনেক ধরণের অনেকেরই মনের মধ্যে ক্ষোভ আছে। দুই চারটা ঘটনা ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু না।
“কিন্তু পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় আছে, আমাদের পর্যাপ্ত ডিপ্লোয়মেন্ট আছে। যারা এই কাজগুলার সাথে জড়িত বা যারা চেষ্টা করতেছে তাদেরকে আমরা আইনের আওতায় আনবো। আমরা চেষ্টা করতেছি, আপনারাও আমাদেরকে সহায়তা করবেন।”
আশুরা উপলক্ষে পুলিশের যতো নিরাপত্তা
আগামী রোববার ১০ মহরম, পবিত্র আশুরা উপলক্ষ্যে ডিএমপির গৃহিত নিরাপত্তার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার ও অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. সরওয়ার বলেন, “আশুরাকে কেন্দ্র করে ডিএমপি প্রতিবছর একটি সুসংহত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। এ বছরও যথাযথ গুরুত্বের সাথে পবিত্র আশুরার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বা হবে।”
আশুরাকে কেন্দ্র করে মহররমের এক তারিখ থেকে ১০ তারিখ পর্যন্ত ঢাকার হোসাইনী দালানের ইমামবাড়া, বড়কাটরা, মোহাম্মদপুর বিহারীক্যাম্প, শিয়ামসজিদ, বিবিকা রওজা, মিরপুর পল্লবী বিহারী ক্যম্পসহ অন্যান্য স্থানে ইতোমধ্যেই পর্যাপ্ত পুলিশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শিয়া ধর্মীয় ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট নেতাদের সাথে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমন্বয় সভা করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ইমামবাড়ার আশেপাশের এলাকায় চেকপোস্টের তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে, পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন উঁচু ভবনের ছাদে সাদা পোশাকে এবং ইউনিফর্মে পুলিশ উপস্থিত থেকে সার্বক্ষনিক নজরদারিসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা পালন করছে।”
ইমামবাড়ায় অনুষ্ঠান শুরুর আগে ডিএমপির সিটিটিসির ডগ স্কোয়াড দ্বারা সুইপিং করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “গুরুত্বপূর্ণ ইমামবাড়া সিসিক্যামেরা দ্বারা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং এর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাইবার পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে মনিটরিং করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সকল অনুষ্ঠানস্থলের প্রবেশপথে আর্চওয়ে গেইট স্থাপন, হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশির ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগত সকলকেই তল্লাশির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে হবে।”
“নারীদের তল্লাশির জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক নারী পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে, গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের স্থির এবং ভিডিওচিত্র ধারণের ব্যবস্থা থাকবে। ইউনিফর্ম পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে” বলেন তিনি।
তাজিয়া মিছিলের মাঝপথে প্রবেশ নয়, ধাতব ও দাহ্য পদার্থ নিষিদ্ধ
ঢাকায় বৃহস্পতিবার তিনটি, শুক্রবার ১১ টি, শনিবার ১৭ টি এবং রোববার ১৯ টিসহ মোট ৫০ টি তাজিয়া বা শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হওয়ার তথ্য দিয়েছেন মো. সরওয়ার।
শোক মিছিলে ডিএমপি যথাযথভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “যে সকল রাস্তায় তাজিয়া বা শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হবে সেসকল রাস্তায় পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ ফোর্স মোতায়েন থাকবে।”
“রাস্তার পার্শ্ববর্তী উঁচু ভবনে পোশাকে এবং সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে। তাজিয়া মিছিলের সামনে পেছনে এবং মধ্যবর্তী স্থানে পুলিশের স্পেশাল টিম বা দক্ষ টিম মেতায়েন থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাসমূহ সিসিক্যামেরার আওতায় থাকবে এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ওয়াচটাওয়ারও স্থাপন করা হবে।”
বড় মিছিল শুরুর পূর্বে সংশ্লিষ্ট এলাকা সুইপিং করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “ফুটপাতে কোন দোকপাট বা অন্য কোন প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা যথাসময়ে অপসারণ করা হবে বা সরিয়ে দেওয়া হবে।”
মিছিল আয়োজনকারী এবং অংশগ্রহণকারীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, “তাজিয়া মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা যেন কোনপ্রকার ধাতব পদার্থ, দাহ্যপদার্থ, ছুরি, চাকু, তরবারী, লাঠি, বল্লাম, ব্যাগ বা বিভিন্ন সুটকেস, ছাতা বা সন্দেজনক প্যাকেট নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে বা মিছিলে না আসেন। এই মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা যেন আতশবাজি বা পটকা ব্যবহার না করেন।”
পাঞ্জা মেলানোর সময় অনেকসময় ভীতি সঞ্চার হয়, যেন এটি না হয় সেই ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি রাতে পাঞ্জা মেলানো থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকতে বলেন তিনি।
মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা উচ্চমাত্রায় শব্দতৈরির যন্ত্র বাজিয়ে ঢাকাবাসীকে ‘বেশি বিরক্ত না করার’ বিষয়টিও খেয়াল রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “মিছিলে সুশৃঙ্খলভাবে সবাই যেন অংশগ্রহণ করে এবং মিছিল শেষে সুশৃঙ্খলভাবে যার যার গন্তব্যে চলে যাওয়ার আহ্বান।
“মিছিল চলাকালে নিশানের উচ্চতা বেশি হওয়ার কারণে অনেক সময় দূর্ঘটনা ঘটে, রাস্তায় অনেক তার থাকে খেয়াল রাখতে হবে। যারা মিছিলে অংশগ্রহণ করবে, তারা যেন মিছিল শুরুর পূর্বেই অংশগ্রহণ করে এবং মাঝপথে অংশগ্রহণ যাতে না করে।”
ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানে যা থাকছে
ট্রাফিক ‘ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানে’ বড় মিছিলগুলোর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “হোসাইনী দালান থেকে শুরু হয়ে নিলক্ষেত মিরপুর রোড, ঢাকা কলেজ, সায়েন্সল্যাবরেটরি, ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা, বিজিবি চার নম্বর গেইট, সাত মসজিদ রোড হয়ে ধানমন্ডি লেক ‘কারবালায়’ মিলিত হবে, মূলত এই কারবালায় কয়েকটা মিছিল যাবে বড় বড়।
“জনগনের প্রতি আহ্বান এই মিছিলের সময়কালে যাতে এই এলাকা এড়িয়ে অন্য এলাকা দিয়ে যাতায়াত করেন।”








